সৎ নেতার খোঁজে আ.লীগ

আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দল গোছানোর কাজ শুরু করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দল গুছিয়ে নতুন উদ্যোমে আগামী নির্বাচনে চতুর্থ বারের মত জয় ছিনিয়ে আনতে চায় দলটি। তাই দলের দুর্নীতিবাজ, বিতর্কিত, অপরাধ প্রবণ, দলীয় কোন্দনে জড়িত, কমিটিতে পদ বিক্রিকারী,

নেতাকর্মীদের সাথে খারাপ আচরণকারী নেতাদের বাদ দিয়ে সৎ ও দক্ষ নেতৃত্ব দিয়ে দল সাজাচ্ছে আওয়ামী লীগ। এ নিয়ে জেলা উপজেলায় সম্মেলন কর্মযজ্ঞ চলছে। আগামী ঈদ উল আযহার আগে মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা-উপজেলায় সম্মেলন শেষ করবে দলটি। এ লক্ষ্যে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন কেন্দ্রীয় নেতারা; নিয়মিত চলছে ভার্চুয়াল মিটিং।

এছাড়া বছরের শেষে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন উদ্যোমী কমিটির মাধ্যমে আগামী নির্বাচনে জয় ছিনিয়ে আনতে প্রস্তুত হবে ক্ষমতাসীনরা। আগামী নির্বাচনে দলের বিতর্কিত এমপিদের মনোনয়ন না দিয়ে সৎ, যোগ্য, জনপ্রিয় প্রার্থীদের মনোনয়ন দেয়া হবে বলে জানিয়ে দলটির হাই-কমান্ড।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য অ্যাড. জাহাঙ্গীর কবির নানক ইনকিলাবকে বলেন, বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে জেলা-উপজেলায় কমিটি হচ্ছে। এটি কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত প্রত্যেক নেতাকর্মীদের জন্য বিশেষ বার্তা যে, আমাদের দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকল কিছু জানেন, খোঁজ খবর রাখেন। কেউ দলের ক্ষতি করে, দুর্নীতি করে পার পাবেন না।

এরই অংশ হিসেবে ঝিমিয়ে পড়া জেলা-উপজেলাকে উদ্দীপ্ত করতে নতুন নেতৃত্ব আনা হচ্ছে। সম্প্রতি পাবনা, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, কক্সবাজার, পঞ্চগড় জেলাসহ আরও অন্তত অর্ধশত উপজেলা, থানা ও পৌর আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইতোমধ্যে আরও প্রায় ১০টি জেলার সম্মেলনের তারিখ চূড়ান্ত করা হয়েছে। নাটোরে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শফিকুল ইসলাম শিমুল এমপির পরিবর্তে সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শরীফুল ইসলাম রমজানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়েছে।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এম এম কামাল হোসেন ইনকিলাবকে বলেন, যারা অপরাধী, যাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে, বিস্তর অভিযোগ রয়েছে তা যাচাই বাছাই করে ওই নেতাদের সম্মেলনে প্রার্থীতা থেকেই বাদ দেয়া হচ্ছে। এছাড়াও যারা প্রার্থী হচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে কী না তা সম্মেলনের মাঠেই কর্মীদের কাছে জানতে চাওয়া হচ্ছে। যার ফলে সচ্ছ, সৎ ও দক্ষ নেতৃত্ব উপহার দিতে পারছি আমরা।

২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর ২০১৯ সালের সেপ্টম্বর মাস থেকে শুরু হয় শুদ্ধি অভিযান। তখন থেকে দলের ভিতরে রাজনৈতিক দুবৃত্তরা পর্দার আড়ালে চলে যায়। তখন স্বেচ্ছাসেবক লীগ থেকে সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওছার সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথ, যুবলীগ থেকে চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীকে দল ও সম্মেলনের সকল কার্যক্রম থেকে বাদ দেয়া হয়। ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম

রাব্বানীকে দুর্নীতির দায়ে অব্যহতি দেয়া হয়। গ্রেফতার হন যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, খালেদ মাহমুদ ভূইয়া, এনামুল হক আরমান, জি কে শামীম, কৃষক লীগ নেতা শফিকুল আলম, মোহামেডান ক্লাবের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, গেন্ডারিয়ার আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক এনু, রুপম ভুঁইয়া এবং অনলাইন ক্যাসিনো এর মূল হোতা সেলিম প্রধান। পরবর্তীতে পাপিয়া, রিজেন্টের সাহেদকে গ্রেফতার করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় জেলা উপজেলায় শুদ্ধি অভিযান চালাচ্ছে আওয়ামী লীগ। কোন বিতর্কিত নেতাকে পদ দেয়া হচ্ছে না। এছাড়া কোন্দন নিরসনে কাজ করছে কেন্দ্রীয় আটটি টিম। যেখানে কোন্দন নিরসন হচ্ছে না সেখানে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আসা হচ্ছে। তবে এ কাজ সামাল দিতেও অনেক কাঠখোড় পোহাতে হচ্ছে নেতাদের। সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন বলেন, কেউ সম্মেলন করতে চায় না।

জোর করে সম্মেলন করতে হয়। সম্মেলন না হলে বর্তমান নেতারা আরো কিছু সময় থাকতে পারেন তাই তারা সম্মেলন করতে চান না। কোন্দল মেটাতেও যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে। রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সংঘর্ষ হয়েছে। এর জেরে দুটি মারধরের ঘটনা ঘটেছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও বাঘা পৌরসভার সাবেক মেয়র আক্কাস আলীর (সদ্য বহিষ্কৃত) সমর্থকদের মধ্যে মারামারি হয়।

সূত্র জানায়, মারামারি বা অন্য কোন সমস্যা হোক সম্মেলন বন্ধ রাখবে না আওয়ামী লীগ। মাঠের সমস্যা মাঠেই সমাধান করে কমিটি করার নির্দেশনা দিয়েছেন হাইকমান্ড। এর ধারাবাহিকতায় ৩১ মার্চের মধ্যে খুলনা বিভাগের অন্তর্গত ১২টি উপজেলার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। ১২ মে মাগুরা, ১৪ মে মেহেরপুর, ১৫ মে চুয়াডাঙ্গা এবং ১৬ মে ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। সিলেট বিভাগের ৫টি সাংগঠনিক জেলা রয়েছে। এর মধ্যে চারটির সম্মেলন হয়েছে। এই বিভাগে সুনামগঞ্জ জেলার সম্মেলন বাকি আছে। রোজার পরে জেলা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে পারে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিন মাসের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো সম্মেলনের মাধ্যমে ঢেলে সাজানোর নির্দেশনা দিয়েছেন। মাঝখানে আবার রোজা আছে। এজন্য হয়তো আরেকটু সময় লাগতে পারে। তবে আমরা তিন মাস টার্গেট করেই কাজ করছি।

এই সময়ের মধ্যে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা সম্মেলন করব। এর মধ্য দিয়ে আমরা দলকে আরও সুসংগঠিত করে ঢেলে সাজাব। তিনি আরও বলেন, ভোটের রাজনীতিতে তো জনসমর্থন সবচেয়ে বড় কথা। সামনে যেহেতু দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আমরা সেটা মাথায় রেখেই জাতীয় সম্মেলনসহ অন্য কাজগুলো করছি।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান বলেন, আগামী জাতীয় সম্মেলনের প্রস্তুতি আমরা শুরু করেছি। এর মধ্য দিয়ে আমরা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতিও গ্রহণ করছি। আশা করি- আগামী ডিসেম্বরে, আমাদের জাতীয় সম্মেলনের আগেই আমরা সব মেয়াদোত্তীর্ণ সংগঠনের সম্মেলন শেষ করতে পারব ইনশাআল্লাহ।

প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের ২০-২১ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতি পদে নবমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচিত হন। দ্বিতীয়বারের মতো সাধারণ সম্পাদক হন ওবায়দুল কাদের। তিন বছর মেয়াদি এই সম্মেলনের মেয়াদ শেষ হবে এ বছর ডিসেম্বরে। আগামী ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের জাতীয়

নির্বাচনকে সামনে রেখে তাদের লক্ষ্য আগেভাগেই জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে দলকে ঢেলে সাজানো। এরপর এক বছর নির্বাচনকেন্দ্রিক কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। জাতীয় সম্মেলনের এই প্রস্তুতির সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের সামনে আরও বেশি কিছু কাজ করতে হবে। সম্মেলন ও দল গোছানোর পাশাপাশি নির্বাচনি ইশতেহার প্রণয়ন, দলীয় প্রার্থী বাছাই, প্রশিক্ষিত এজেন্ট তৈরিসহ নানা কাজে মনোযোগ দিতে হবে তাদের।

কার্যনির্বাহীর চার পদ পূরণ করবে আ.লীগ : এদিকে আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় ২২তম জাতীয় কাউন্সিলের পূর্বেই শূন্য হয়ে থাকা কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য পদগুলো পূরণ করার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। তবে শূন্য পদে রাজনীতিক কর্মীর চেয়েও আমলা, ব্যবসায়ী ও ব্যাংকাররা আসতে পারেন বলে ক্ষমতাসীন দলটির একাধিক সূত্র জানিয়েছেন।

এ তালিকায় আলোচনায় আছেন, বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের কিউরেটর এনআই খান, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক এপিএস আলাউদ্দিন নাছিম, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সাবেক সচিব সাজ্জাদুল হাসান, ঢাকা-১০ আসনের এমপি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান নাফিস সারাফাত।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশন শেষে ৮১ সদস্যের কমিটির কয়েকজনের নাম ঘোষণা করেন সভাপতি শেখ হাসিনা। কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি সদস্য সংখ্যা অনুমোদন হয় ২৮ জনের। কাউন্সিলের দিন কমিটি ঘোষণা হলেও বেশ কয়েকটি সদস্য পদ শূন্য ছিল। এরপর প্রথমে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনকে দলে অর্ন্তভুক্ত করা হয়। তারপর আজিজুস সামাদ আজাদ ডন ও সৈয়দ আব্দুল

আউয়াল শামীমকে সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করেন দলের হাইকমান্ড। গঠতন্ত্র অনুযায়ী সদস্য পদ পূরণ হলেও করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যান পটুয়াখালী-৩ আসনের (গলাচিপা-দশমিনা) সাবেক সংসদ সদস্য আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসাইন ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। তারা দুই জনেই আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য ছিলেন। তাদের মৃত্যুতে দুইটি পদ শূন্য হয়েছে। অন্যদিকে বছরের ১৯ নভেম্বর দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

গণভবনে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে তিন জনকে প্রেসিডিয়াম সদস্য করে দলে অন্তর্ভুক্ত করেন। তারা হলেন- রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র ও রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম ও অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম। প্রেসিডিয়াম পদে পদোন্নতি হওয়া কার্যনির্বাহী সদস্য পদে দুই পদ শূন্য হয়। সব মিলিয়ে বর্তমানে দলের চারটি শূন্য রয়েছে।