হাজী সেলিমের এতো অপকর্ম কিভাবে এতদিন ঢাকা ছিল !

হাজী সেলিমের এতো অপকর্ম কিভাবে এতদিন ঢাকা ছিল !

বছর সাতেক আগের কথা। বংশালে ছোট্ট একটু জায়গার মালিক এক সাংবাদিক পরিবার। আধা কাঠারও কম হবে ওই জায়গার পরিমাণ। ওই পরিবারের সেখানে একটি দোকান আছে। ওই সম্পত্তির দিকে চোখ পড়ে হাজী সেলিমের। আশপাশের সব জায়গা আগেই দখলে নিয়েছে। কারোটা জোর করে। কাউকে পয়সা কড়ি ধরিয়ে দিয়ে।

ওই সাংবাদিকের অতটুকু জমি না হলে তার মার্কেটের ডিজাইনটা ভালো হয় না! তাই অটুকু তার চাই-ই চাই। এ নিয়ে অনেক দেন-দরবার। এখনো ওই জায়গাটুকুর উপর দিয়ে দৃষ্টি সরেনি। এভাবে অনেক মানুষের বাড়িঘর, সরকারি সম্পত্তি, স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি হাজী সেলিমের দখলে। কিন্তু সবাই সয়ে যাচ্ছেন। ভয়ে কেউ রা শব্দটিও করেন না।

সেই হাজী সেলিম আবারো আলোচনায় এসেছে ছেলে এরফানের স’ন্ত্রা’সী ক’র্মকা’ণ্ডের মধ্য দিয়ে। বেরিয়ে আ’সতে শুরু করেছে হাজী সেলিমের নানা অপকীর্তি। স্থানীয় সূত্র জানায়, লালবাগের ৫৬/৩/বি রাজ নারায়ণ ধর রোডে লালবাগের তিনতলা বাড়ির মালিক মো: আজিম উদ্দিন ও তার আট ভাইবোন। এ বাড়ির পাশেই রয়েছে হাজী সেলিমের ছোট্ট একটু জমি। ওই জমিতে ভবন করতে গিয়ে তার নজর পড়ে পাশের তিনতলা ভবনের ওপর।

জমিটি কব্জা করতে নানা কৌশল এঁটে আর হু’মকি-ধ’মকি দি’য়েও ব্যর্থ হন তিনি। এরই মধ্যে আজিম উদ্দিন যখন পবিত্র হজব্রত পালনের উদ্দেশে সৌদি আরব যান, তখন সুযোগ বুঝে তাদের তিনতলা ভবনটি ভেঙে মাটির সাথে মিশিয়ে দেন হাজী সেলিম। ওই জমি এখন হাজী সেলিমের দখলে। গত ৯ বছর ধরে নানাভাবে চেষ্টা করেও জমিটি ফেরত পাননি আজিম উদ্দিন।

সেই নব্বইয়ের দশক থেকেই হাজী সেলিমের নানা অন্যায় অবিচার সয়ে আসছেন পুরান ঢাকার মানুষ। কথায় কথায় মানুষের প্রতি জু’লুম নি’র্যাত’নের কারণে হাজী সেলিম গত তিন দশক ধরে পুরান ঢাকার এক আ’ত’ঙ্কের নাম। শুরুতে তিনি বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন এবং ওয়ার্ড কমিশনার ছিলেন।

১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন চেয়ে না পেয়ে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন নেন। এরপর নৌকা মার্কা নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয় লাভও করেন। এরপরই লালবাগ, চকবাজার ও হাজারীবাগ এলাকায় গড়ে তোলেন তার একচ্ছত্র আ’ধিপত্য। স্থানীয় দুদ মিয়াসহ এ সময় অনেকেই হাজী সেলিমকে সহযোগিতা করেন।

স্থানীয় সূত্র জানান, হাজী সেলিমের মূল টার্গেটই ছিল বিবদমান সম্পত্তি, সরকারি সম্পত্তি, ওয়াকফ সম্পত্তি। এমনকি, আদি বুড়িগঙ্গা নদীর জমিও দখল করার অভিযোগ আছে হাজী সেলিমের বিরুদ্ধে। মিটফোর্ড এলাকার ৪৭ নগগোলা রাজবাড়ি এলাকার প্রায় ২০০ পরিবার এখনো পথে পথে ঘুরছেন তাদের সম্পত্তি ফিরে পাওয়ার জন্য।

ভাওয়াল স্টেটের সম্পত্তি সরকারের কাছ থেকে লিজ নিয়ে ওই পরিবারগুলো তাদের বসতি গড়েছিলেন। কেউ কেউ সেই সম্পত্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্যও শুরু করেছিলেন দোকান-পাট দিয়ে। ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে ওই লোকদের তাদের বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে তা দখল করে নেয় হাজী সেলিম। চকবাজার মোড়ের ১৬ তলা ভবন আশিক টাওয়ার মালিককে জোর করে বের করে দিয়ে দখল করে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ আছে।

ভবন তো দখল করে নিয়েছেই, ওই ভবনের মালিককে পালিয়ে বাঁচতে হয়েছে। বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল কামরাঙ্গীরচরের রহমতবাগের পাশে বিশাল জায়গা দখল করে সেখানে ভবনও নির্মাণ করেছিলেন হাজী সেলিম। এ নিয়ে গণমাধ্যমে লেখালেখি শুরু হলে প্রশাসন ওই ভবন ভেঙে ফেলে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, হাজী সেলিম ছোট কাটরা ও বড় কাটরা এলাকা নিয়ে হাজী সেলিম নগর নামকরণ করতে চেয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত তা আর হয়ে ওঠেনি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অনেক আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন হাজী সেলিমের দখল থেকে তাদের হল উদ্ধারের জন্য। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন।

উল্লেখ্য, গত রোববার সন্ধ্যার পরে রাজধানীর ধানমন্ডির কলাবাগান এলাকায় নৌ বাহিনীর লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ আহমেদ খানকে মারধর করেন হাজী সেলিমের ছেলে এরফান সেলিমের বডিগার্ড মোহাম্মদ জাহিদ, হাজী সেলিমের মদিনা গ্রুপের প্রটোকল অফিসার এ বি সিদ্দিক দিপু এবং গাড়িচালক মিজানুর রহমানসহ অজ্ঞাত আরো দু-তিনজন।

পরে জনতার রোষে এরফানসহ তার বডিগার্ডরা পালিয়ে যায়। এই ঘটনায় ওয়াসিফ গত সোমবার ধানমন্ডি থা’নায় একটি মামলা দায়ের করেন। মালার এজাহার নামীয় সব আসামিই বর্তমানে গ্রে’ফতার রয়েছে। এ দিকে এই ঘট’নার পর আবারো আলোচনায় উঠে আসে হাজী সেলিম পরিবার। সরকারের সংস্থাগুলোও উঠে বসেছে সেলিমের সম্পত্তির বিবরণ নিতে। এ দিকে এসব ঘটনা জানতে হাজী সেলিমের মোবাইলে কয়েকবার ফোন দিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।