ভারত-চীন লড়াইয়ে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?

ভারত-চীন লড়াইয়ে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?

দক্ষিণ এশিয়া দীর্ঘদিন ধরে ভারতের একচ্ছত্র প্রভাব বলয়ের মধ্যে ছিল। সম্প্রতি চীন কৌশলগত কারণে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এ অঞ্চলে তার উপস্থিতি জোরেশোরে জানান দিচ্ছে।

চীন ইতোমধ্যে এখানকার রাষ্ট্গুলোর সাথে সফলভাবে বন্ধুত্বপুর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করেছে। আর ওদিকে দিন দিন বন্ধুহীন হয়ে পড়ছে ভারত। এশিয়ার দুই পরাশক্তি চীন ও ভারতের আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে বাংলাদেশ এখনও পর্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্র নীতি অনুসরণ করে যচ্ছে।

ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অবস্থান কেমন হবে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলছে নানা বিচার-বিশ্লেষণ। ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো যে ধরনের পররাষ্ট্রনীতির অনুসরণ করে তাকে ইংরেজিতে বলে ‘পাইলট ফিশ বিহেভিয়র’ তথা ‘বড় মাছ ঘেঁষা নীতি’।

সোজা বাংলায় শক্তিশালী রাষ্ট্রের সাথে সহ অবস্থান নীতি যেন তার দ্বারা কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলকথা ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ তারই প্রতিফলন।

স্বাধীনতার পর থেকে এর আলোকেই বাংলাদেশ বৈদেশিক নীতি পরিচালনা করে আসছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর সাথে ঐতিহাসিকভাবে ভারত ‘বিগ ব্রাদারলি এটিচুড’ তথা বড় ভাইসুলভ আচরণ করে আসছে। দেশগুলোর সব ব্যাপারেই খবরদারি এবং দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে ভারত এমন কথা সুস্পষ্টভাবেই বলা আছে গুজরাল ডক্ট্রিন, ইন্দিরা ডক্ট্রিনে। যুক্তরাষ্ট্র যেমন পুরো আমেরিকাকে নিজের এখতিয়ারে রাখতে চায় মনরো ডক্ট্রিনের ছায়ায়, ভারতের মনোভাবও তেমন আধিপত্যবাদী।

স্বভাবতই ভারত এ অঞ্চলে নিজের স্বার্থেই চীনের মত অন্য কারো খবরদারি বরদাস্ত করবে না। এজন্য যুক্তরাষ্ট্রকে সাথে নিয়ে চীনকে মোকাবেলায় বিভিন্ন পলিসিও গ্রহণ করেছে যার মধ্যে ‘ফ্রি এন্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক (এফওআইপি)’ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৪৯ সালে চেয়ারম্যান মাও জেডং এর নেতৃত্বে চীনে সমাজতন্ত্র কায়েম হওয়ার পর তার লক্ষ্য ছিলো দেশের মধ্যকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সব ক্ষেত্রে চীনকে স্বাবলম্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।

১৯৮০ এর দশকে চীন তার গৃহীত নীতিগুলোর ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে প্রবেশ করে এবং বিভিন্ন দেশের সাথে শুধু অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে দৃষ্টি দেয়। ২০১৩ সালে শি চিনপিং কর্তৃক ‘বেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)’ এর ঘোষণা ছিল সবচেয়ে বড় চমক যেটি এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের ৬৫ টিরও অধিক দেশকে যুক্ত করবে এবং বিশ্বব্যাপী চীনা প্রভাব বৃদ্ধি করবে।

এরই ধারাবাহিকতায় চীন অর্থনৈতিক বিষয়গুলোর পাশাপাশি অন্য দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক বিষয়গুলো নিয়ে মাথা ঘামাতে শুরু করে। আফ্রিকাতে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার দিকেও হাত বাড়ায় এবং এটাই ভারতের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে যেমন চাণক্য কৌটিল্যের প্রভাব স্পষ্ট, তেমনি চীনও দার্শনিক কনফুসিয়াস ও সুন জুর নীতির প্রতি আস্থাশীল। দুই দেশই আয়তন ও জনসংখ্যায় বৃহৎ এবং তাদের রয়েছে হাজার বছরের আলাদা আলাদা সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সংস্কৃতি।

সমাজতান্ত্রিক চীনের সাথে সোভিয়েত রাশিয়ার প্রভাবাধীন ভারত সম্পর্কোন্নয়নে ১৯৬০ এর দশকের শুরুতে ‘হিন্দি-চিনি ভাই ভাই’ স্লোগানের সূচনা করে। ১৯৬২ তে ঘটে যাওয়া ইন্দো-চীন যুদ্ধ দুই দেশের সম্পর্কে ফাটল ধরায়। উল্লেখ্য সীমান্ত নিয়ে উত্তেজনা আরো আগে থেকে বিরাজ করছিলো তাদের মধ্যে। এরপরে ‘৬৫ এর পাক-ভারত যুদ্ধ এ অঞ্চলের ভূ রাজনৈতিক সমীকরণ অনেকটাই বদলে দেয় যখন ভারতের আধিপত্য থেকে মুক্ত হয়ে পাকিস্তান নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাশ্মীরের একটি নির্দিষ্ট এলাকা চীনকে দিয়ে দেয়।

চীনের বিআরআই বাস্তবায়ণে এই অঞ্চলটি এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ এখানেই আছে ‘চাইনা পাকিস্তান ইকনোমিক করিডোর (সিপিইসি)’। ২০১৩ সালের পর থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সাথে চীন সম্পর্ক জোরদারে আগের তুলনায় বেশি মনোযোগ দেয় এবং এক্ষেত্রে তুরুপের তাস হিসেবে কাজ করে চীন সরকার প্রদত্ত আর্থিক সহায়তা। একইসাথে ভারত মহাসাগরে চীনের সামরিক উপস্থিতিও বাড়তে থাকে।

এতে পাকিস্তানের গোয়াদার পোর্ট এবং শ্রীলংকার হাম্বানটোটা পোর্টের সমস্ত সুবিধাই গ্রহণ করে চীন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, দুটো বন্দরই চীনা অর্থায়নে নির্মিত এবং বিআরআই এর অংশ। পাকিস্তান-ভারত বৈরিতার সুযোগে চীনা-পাক সম্পর্ক অনেক আগে থেকেই বিশ্বস্ততার সুতোয় গাঁথা। এদিকে ভারতের দীর্ঘদিনের মিত্র দেশগুলোও এর সাথে সম্পর্কের তিক্ততা এবং নিজেদের অর্থনৈতিক প্রয়োজনে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

‘পাপেট গভমেন্ট’ তথা ‘পুতুল সরকার স্থাপন করে শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, নেপাল, আফগানিস্তান ও ভুটানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চীন-ভারত রাজনৈতিক কলকাঠি নাড়তে শুরু করে। অনেক জলঘোলার পরে ভারত চীনের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়। আদতে তারা চীনা অর্থের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোতে চীন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত হলেও বাংলাদেশকে কাছে টানতে এত দিন শুধু অর্থনৈতিক সহায়তারই আশ্রয় নিয়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ভারতের পরীক্ষিত মিত্র এমন কথা বিভিন্ন সময়ে উঠে এসেছে দেশি-বিদেশি পত্র-পত্রিকায়। চীন প্রকাশ্যে মাথা ঘামায়নি বিষয়টি নিয়ে কারণ অর্থনৈতিকভাবে ঠিকই বাংলাদেশ চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছিলো দিন দিন। কংগ্রেসের পর ভারতের বিজেপি সরকারও বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ সরকারের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখলেও তাদের মাঝে উদ্বেগের ছাপ ছিলো স্পষ্ট। ২০১৬ সালে চীন থেকে দুটো পুরনো সাবমেরিন কেনার পর সেটি সবার দৃষ্টিগোচর হয়।

ভারত সরকার এরপর নানা অজুহাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং মন্ত্রীদের ভারত সফর বাতিল করে এবং বাংলাদেশকে চাপ দিতে থাকে ভারতের সাথে অর্থনৈতিক ও সামরিক বিভিন্ন চুক্তি সম্পাদন করতে। সীমান্তে হত্যা, অসম পানি বণ্টন চুক্তি, এনআরসি, জনগণের ভারত বিদ্বেষসহ নানা কারণে সাম্প্রতিক সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। গত বছর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে চীনা-বাংলাদেশ যৌথ অর্থায়নে নির্মাণাধীন প্রকল্পগুলোর অনিশ্চয়তার কথা উঠে এসেছে।

অনেক প্রকল্পের অর্থই চীন প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রদান করছে না। স্বভাবতই এসব কারণে অনেক চাপে ছিলো বাংলাদেশ সরকার। তাছাড়া ২০১৮ এর নির্বাচন, দেশের অভ্যন্তরীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি, অর্থ পাচার এবং দুর্নীতিও দারুণ বিপাকে ফেলে। এর মধ্যে আবার করোনার হানা। পরিস্থিতি যখন টালমাটাল তখনই নতুন করে চীনা সহায়তার আশ্বাস। চীনের বাজারে নতুন করে আরও ৫,১৬১ টি বাংলাদেশি পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে।

এবার অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতি নজর চীনের। বাংলাদেশের ৬টি শহরে চীনের সিস্টার-সিটি নির্মাণের প্রস্তাব সে ইঙ্গিতই বহন করে। এটি বাস্তবায়িত হলে দুটি দেশের ভিন্ন ভিন্ন শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে আন্তঃনাগরিক যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে। সম্প্রতি গালওয়ানে চীন-ভারতের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সীমান্ত সংঘাতের সময়ে এ খবর যে ভারতের মুখে বড় চপেটাঘাত তা দৃশ্যমান সে দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিক্রিয়ায়।

ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থান বিবেচনায় বাংলাদেশকে চার দিক থেকে ঘিরে আছে ভারত- যদি আমরা আন্দামান-নিকোবরে ভারতের সামরিক উপস্থিতির কথা বিবেচনা করি। স্বাধীন বৈদেশিক নীতি প্রণয়নে এটি এর জন্য একটি বাঁধা হলেও একুশ শতকের বাস্তবতায় বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব একেবারে ফেলনা নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক রবার্ট কাপলানের ভাষ্যমতে এ শতাব্দীতে শক্তিধর দেশগুলো ভারত মহাসাগরে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য লড়বে।

গত বিশ বছরে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা সে ইঙ্গিতকে আরো সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। এ দিক বিবেচনায় কৌশলগত কারণে বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত বাংলাদেশের ভূখণ্ডে পড়া সেন্ট মার্টিন ও সোনাদিয়া দ্বীপের গুরুত্ব তাই অনেক। স্বাধীনতার আগ থেকেই আমেরিকার দৃষ্টি ছিল সেন্টমার্টিনের দিকে। সেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের জন্য অনেক কিছু তারা করেছে এবং সে তৎপরতা এখনও চলমান। এ জায়গায় যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি এশিয়ার বৃহৎ দুই শক্তি চীন ও ভারতের জন্য হয়ে পড়বে অস্বস্তিকর।

যুক্তরাষ্ট্র আপাতত চীনের আধিপত্য রুখতে বেশি সাহায্য নিচ্ছে ভারতের। সরাসরি নিজে কিছু করার চেয়ে ভারতকেই ব্যবহার করছে হাতিয়ার হিসেবে। এজন্য ভারতকে ছাড় দিচ্ছে বিভিন্ন ইস্যুতে- কাশ্মীর সংকট, এনআরসি, সাম্প্রদায়িকতা, পরমাণু শক্তি বৃদ্ধিকরণ ইত্যাদি। তাছাড়া চীনের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করতে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, জাপান ও ভারতকে সাথে নিয়ে আনজুস (ANZUS) ও কোয়াড (Quad) এর মত সম্মিলিত প্রচেষ্টা তো রয়েছেই।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নাই। এক সময়ের মিত্র দেশ পাকিস্তানের সাথে তাই এখন আমেরিকার দহরম-মহরম তলানিতে। পাকিস্তানও সুযোগ বুঝে চেপেছে চীনের কাঁধে। চির শত্রু ভারতের সাথে তার একাত্ম হওয়া অসম্ভব। নেপালও তার ওপর থেকে ভারতের দীর্ঘদিনের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, ভুটান, আফগানিস্তানের বেলায়ও একই রকম দৃশ্য লক্ষ্য করা যায়।

ভারত নিজেই যেখানে চীনা অর্থের জন্য হা করে থাকে, সেখানে প্রতিবেশী দেশকে কব্জায় রাখতে খুব বেশি কিছু করে উঠতে পারছে না। চীনের বিশাল অর্থনীতির কাছে বড় ভাইসুলভ আচরণ তাই নস্যি। চীনের লক্ষ্য ২০৪৯ সালের ভিতরে অর্থনীতিতে বিশ্বের এক নম্বর দেশ হওয়া। সে পথে ইতোমধ্যে অনেক দূর সে এগিয়েছে। আর শুধু এশিয়া নয়, বিশ্বের মোড়ল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার খায়েশ তার।

এর জন্য যা করা দরকার তা সে করতে প্রস্তুত। প্রথম দিকে শুধু টাকা ছিটিয়ে এ বিরাট কার্য সমাধায় ব্রতী হলেও এখন সে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণেও ব্যস্ত সময় পার করছে। বিআরআইকে সফল করার জন্য জলপথ ও স্থলপথের নিশ্চয়তা বিধান করার জন্য এটি দরকার। নচেৎ সারা দুনিয়ায় আটশোর বেশি ঘাঁটি থাকা আমেরিকার সাথে সে পেরে উঠতে পারবে না। তাছাড়া পথের কাঁটা হিসেবে আমেরিকার অন্য সব সঙ্গী-সাথী তো আছেই।

চীন শুরতে বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছিলো তার এ কাজে অন্যতম সহায়তাকারী হিসেবে। সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের প্রাথমিক কাজ তারা করলেও শেষ মুহূর্তে ভারতের চাপে শেষ করতে পারেনি। বাধা পেয়ে তারা মায়ানমারকে সাথে নিয়ে কার্য সম্পাদনে নেমে পড়ে। দেশি-বিদেশি অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের কাজ চীনকে দিলে ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট বাংলাদেশকে পোহাতে হতো না।

চীন ইতোমধ্যে এ সংকট নিরসনে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে সে মতের পক্ষেই রায় দিয়েছে। চীনকে রুখতে ভারত বিকল্প অনেক প্রস্তাব করেছে যার মধ্যে বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালকে নিয়ে গঠিত ’বিবিআইএন’ নেটওয়ার্ক অন্যতম। দুদিকে চীন ও পাকিস্তানের মত শত্রুর সাথে সদা লড়াইয়ে ব্যস্ত ভারতের বাংলাদেশের মত একটি বন্ধু রাষ্ট্র প্রয়োজন একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে। তাছাড়া সেভেন সিস্টার্সে যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত ‘চিকেন নেক’- এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যেও বাংলাদেশকে পাশে দরকার এর।

তাদের মনে সব সময় শঙ্কা কাজ করে যদি চীন-বাংলাদেশ এক হয়ে কিছু করে বসে! বাংলাদেশের জপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা মাওলানা ভাসানী দাবী করে গেছেন আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা ফিরে না পেলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মানচিত্র পূর্ণতা পাবে না। এ দাবীতে বাংলাদেশের কিছু মানুষ এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ সরব। ওদিকে এসব রাজ্যও আবার অনেক আগে থেকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের স্বাধীন দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।

ইতিহাস বলে, ভার‍তের আধিপত্যবাদী ও আগ্রাসী পদক্ষেপের কারণেই তারা স্বাধীনতা পাচ্ছে না। দক্ষিণ এশিয়ায় চীন-ভারতের আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে আংলাদেশের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিৎ সে প্রশ্নকে সামনে রেখেই আলোচনা এতদূর গড়িয়েছে। বাংলাদেশ ভারতের আগ্রাসন থেকে মুক্ত হতে চায় এবং নিজেদের ন্যায্য অধিকার চায় পানি বণ্টনসহ বিভিন্ন বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইন-কানুন মেনে। অন্ততঃ বাংলাদেশের অধিকাংশ সাধারণ মানুষের মনোভাব এটাই।

এর জন্য তারা আপাতভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী। যদিও ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী অনেকাংশে চীনের ওপর নির্ভরশীল। অন্য দেশগুলো যখন বাংলাদেশকে সামরিক সরঞ্জাম দিতে অপরাগতা প্রকাশ করেছিল, তখন চীন এগিয়ে আসে। বিশ্বাসযোগ্য সূত্রমতে, বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীতে ব্যবহৃত প্রায় ৭০ ভাগ সরঞ্জাম চীন থেকে ক্রয় করা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে চীনের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীলতা বাংলাদেশের সম্ভব কি না, কিংবা আদৌ এটি বাংলাদেশিদের জন্য সুফল বয়ে আনবে কি না?

বাংলাদেশের ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার বাকি দেশগুলোর মতো না। শুরুতেই বলা হয়েছে ভারত মহাসাগরে সামরিক ঘাঁটিকে আমলে নিলে এটি চারদিক দিয়েই ভারত দ্বারা বেষ্টিত। বাংলাদেশের আরেক প্রতিবেশী রাষ্ট্র মায়ানমারের সাথেও এর সম্পর্ক ভালো নয়। দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকট সম্পর্কের আরো অবনমন ঘটিয়েছে। সীমান্তবর্তী দেশ হওয়ায় এবং সমুদ্রপথে এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর পক্ষে চীনের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভবপর হলেও বাংলাদেশের সে সুবিধা নেই।

তাই বরাবরই এদেশের রাজনীতিতে ভারত একটি বড় ’ফ্যাক্টর’। তার অপব্যবহারও ভারত করে আসছে শুরু থেকেই দেশের অভ্যন্তরীন বিভিন্ন বিষয়ে নাক গলিয়ে। তাছাড়া চীনা অর্থ তথা চীনের ওপর অন্য কোনোভাবে পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়াটাও বাংলাদেশের জন্য সুখকর হবে না। অন্যের কাছে বেশি ধার-দেনা করলে শেষ পর্যন্ত দেশটাকেই বন্ধক রাখতে হবে। এর সত্যতা পার্শ্বভবর্তী দেশগুলোর দিকে তাকালেই মিলবে। তাহলে এ উভয় সংকট থেকে উত্তরণ পেতে বাংলাদেশের করণীয় কী?

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সবাই জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই এখানে। চীনের স্বার্থ আছে বাংলাদেশকে সহায়তা করায়, তাই সে করছে। ভারতের স্বার্থ বাংলাদেশকে কজায় রাখায়, স্বাধীনতার পর থেকে তাই সে করে আসার চেষ্টা করছে এবং অনেকাংশে সফলও। অনেক সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় স্বার্থের চেয়ে দলীয় ও ব্যক্তিগত স্বার্থকে বড় করে দেখেছে এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিয়েছে।

এটি এদেশে প্রতিবেশী দেশটির ব্যাপক আধিপত্য বিস্তারে সহায়তা করেছে। ভারত-চীন দ্বন্দ্বে বাংলাদেশের কোনো পক্ষাবলম্বনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তারা এই সংকটটিকে কাজে লাগিয়ে দু’ দেশের কাছ থেকে দেন-দরবার করে কতটুকু বেশি আদায় করতে পারে তা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ভারতের কাছ থেকে দাবী-দাওয়া আদায়ের সবচেয়ে বড় নেগোসিয়েশন ট্যুল হলো ‘ট্রানজিট’।

ভুলে গেলে চলবে না এ দুই দেশেরই বাংলাদেশকে বন্ধু হিসেবে দরকার নিজ নিজ ফায়দা হাসিলে এবং ক্ষুদ্র দেশ হলেও বাংলাদেশের হাতেও ট্রাম্প কার্ড আছে। এক্ষেত্রে দলীয় প্রভাবমুক্ত স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতিই কেবল পারে বড় শক্তির এই দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করতে এবং সার্বভৌমত্ব সমুন্নত রাখতে।