প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে রেখেছেন আমলারা?

প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে রেখেছেন আমলারা?

প্রধানমন্ত্রী তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা: এবিএম আব্দুল্লাহকে। আব্দুল্লাহ প্রায় প্রতিদিনই গণভবনে যেতেন, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিতে এবং তাকে বিভিন্ন রকমের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পরামর্শ দিতেন।

করোনা প্রকোপ শুরু হওয়ার পরও প্রধানমন্ত্রী এবিএম আব্দুল্লাহকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপুর্ণ বিষয় প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দিয়েছিলেন এই প্রবীণ চিকিৎসক। প্রধানমন্ত্রীও এই পরামর্শগুলোকে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যারা স্বাচ্ছন্দ্যে প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরেন, তাদের মধ্যে এবিএম আব্দুল্লাহ ছিলেন অন্যতম। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে ডা: এবিএম আব্দুল্লাহকে গণভবনে ঢাকা হয়না। কেন ঢাকা হয় না কি কারণে তিনি গণভবনে যান না এ ব্যাপারে কোনো সদুত্তর নেই।

ধারণা করা হচ্ছে যে, প্রধানমন্ত্রীর চারপাশে যেসব প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং আমলারা রয়েছে তারাই হয়তো ডা: এবিএম আব্দুল্লাহ’র নিয়মিত গণভবনে যাওয়াটাকে পছন্দ করেননি। তাদের কারণেই হয়তো ডা: আব্দুল্লাহ গণভবনে নিয়মিত যেতে পারছেন না।

ডা: এবিএম আব্দুল্লাহ একটি উদাহরণ মাত্র। এরকম অনেক উদাহরণ আছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে করোনার অজুহাতে বা বিভিন্ন কারণে প্রধানমন্ত্রীকে রাজনীতিবিদ এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে যারা সঠিক এবং ন্যায় সঙ্গত পরামর্শ দিতো তাদেরকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যেতে দেয়া হচ্ছে না।

এটি কি পরিকল্পিত নাকি কাকতালীয় এ নিয়ে বিতর্ক আছে, প্রশ্ন আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো প্রধানমন্ত্রী এখন অনেক বেশি আমলানির্ভর হয়ে পড়েছেন। আমলারাই এখন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য প্রাপ্তির প্রধান উৎস হিসেবে পরিণত হয়েছেন। যার ফলে অনেক ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রী প্রকৃত তথ্য জানেন কিনা এ নিয়ে রাজনীতিবিদদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।

করোনা সংক্রমনের পর থেকে গত সাত মাসে আওয়ামী লীগের কয়েকটি ক্ষুদ্র বৈঠক ছাড়া কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড হয়নি। প্রধানমন্ত্রী ১৫ই আগস্টসহ বিভিন্ন দিবসের কর্মসূচিগুলোতে গণভবন থেকেই যোগ দিয়েছেন। আর এই সময়ে খুব সীমিত আকারে মন্ত্রী এবং রাজনীতিবিদদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কথোপকথন হয়েছেন।

তবে প্রধানমন্ত্রী প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ নেতার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, টেলিফোনে আলাপ এবং সামনাসামনি একটি বিষয় নিয়ে মতামত এবং পরিস্থিতি বিশ্লেষণ এক বিষয় নয়।

করোনা সংক্রমনের শুরু থেকেই দেখা গেছে, আমলাদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে, আমলাদের প্রভাব বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের ক্ষেত্রে আমলারাই মুখ্য হয়ে উঠেছে। এই সময়ই রাজনীতিবিদদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর যতগুলো বৈঠক হয়েছে তার চেয়ে বেশি বৈঠক হয়েছে আমলাদের সঙ্গে।

আমলারাই প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা-অনিচ্ছা গুলোকে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। আর এ কারণেই প্রধানমন্ত্রীকে অনেক খবর সঠিকভাবে এবং বিশ্বস্ততার সাথে দেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি প্রকৌশলী চিকিৎসক এবং কৃষিবিদরা বিএমএ ভবনে এক প্রাথমিক বৈঠক করেছে।

সে বৈঠকে তারা অভিযোগ করেছে, আমলারা প্রধানমন্ত্রীকে সঠিক তথ্য এবং খবর দিচ্ছেন না। এ প্রসঙ্গে একজন পেশাজীবী নেতা বাংলা ইনসাইডার কে বলেছেন যে, ধরা যাক সিএমএসডি পরিচালক। এই পদটি একটি স্বাস্থ্য ক্যাডারের পদ। এটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে কিনা এ নিয়ে তাদের সন্দেহ রয়েছে।

এছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় পদায়নের ক্ষেত্রে আমলাদের কে প্রাধান্য দেয়ার ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রী চারপাশে যে প্রশাসনের কর্মকর্তা রয়েছে, তারাও ভূমিকা রাখছেন বলে মনে করা হচ্ছে। এমনকি বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালক পদ গুলো এখন আমলারা দখল করে নিচ্ছেন।

আর এটি হচ্ছে মুলত প্রধানমন্ত্রী চারপাশে আমলাদের প্রভাববৃদ্ধির কারণে। একজন পেশাজীবী কর্মকর্তা বলেছেন, একজন আমলাদের দূর্নীতি-অনিয়ম এবং পক্ষপাতিত্বগুলোকে আড়াল করা হচ্ছে। অনেক জায়গায় মাঠ প্রশাসনে স্বাধীনতা বিরোধী পরিবারের লোকজনকে বসানো হচ্ছে।

যেখানে প্রধানমন্ত্রীকে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেয়া হচ্ছে না। এরকম ঘটনা সরকারের জন্য ভবিষ্যতে অস্বস্তিকর হতে পারে বলেও বিভিন্ন পেশাজীবী গ্রুপ মনে করছেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আছে এমন ব্যক্তিরা বলছেন যে, প্রধানমন্ত্রী সব খবর জানেন এবং সব খবর রাখেন।

প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় পরিকাঠামো অনুযায়ী আমলাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকে কাজ করতে হয়। তার মানে এই নয় যে, প্রধানমন্ত্রী আমলাদের উপর নির্ভর। বরং তিনি সবকিছু জানেন এবং সব খবরই রাখেন। প্রধানমন্ত্রী প্রত্যেকে একটা সীমা পর্যন্ত সহ্য করেন এবং তাঁর অসাধারণ সহ্য ক্ষমতা রয়েছে।

কেউ সীমা অতিক্রম করলে তার পরিণতি কি হয়, তা অতীতেও তিনি বিভিন্ন সময়ে দেখিয়াছেন। ভবিষ্যতেও হয়তো দেখাবেন । প্রধানমন্ত্রীকে আমলারা ঘিরে রেখেছে এ ধরনের মন্তব্য যারা করে তারা আসলেই কি প্রধানমন্ত্রীর দূরদৃষ্টি, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং তার বিচক্ষণতার সম্পর্কে সঠিকভাবে ওয়াকিবহাল নয়।