খালেদা-তারেককে নিয়ে ৩ নেতার প্রশ্ন, অ্যাকশনে যাচ্ছে না বিএনপি!

খালেদা-তারেককে নিয়ে ৩ নেতার প্রশ্ন, অ্যাকশনে যাচ্ছে না বিএনপি!

বিএনপির তিন ভাইস চেয়ারম্যান দলের শীর্ষ নেতৃত্ব নিয়ে নানামুখী প্রশ্ন তুলেছেন। এই তিন নেতা হলেন—শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ব্যারিস্টার শাজাহান ওমর।

বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে তারা অভিযোগ করেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগার থেকে আপস করে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি গ্রহণ করেছেন এবং তার উত্তরসূরি হিসেবে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

তিন ভাইস চেয়ারম্যানের এই বক্তব্যের পর বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হলেও স্থায়ী কমিটির সদস্যরা মনে করেন, নেতৃত্বের প্রতি হঠাৎ করে এই অবস্থান ব্যক্ত করার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে।

তবে দলের সিনিয়র এই তিন নেতার বিরুদ্ধে এখনই কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করবে না বিএনপি। স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বলছেন, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব-নিকাশ ও ভবিষ্যতে দলে আর জায়গা না পাওয়ার সম্ভাব্য আশঙ্কা থেকে নেতৃত্বের প্রতি তারা বিরাগভাজন হয়েছেন। একইসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে তাদের অসামান্য ভূমিকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখছে বিএনপি।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বিএনপির স্থায়ী কমিটি ও চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের একাধিক নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে বিএনপির এই মনোভাব জানা গেছে।খালেদা জিয়ার শর্তসাপেক্ষ মুক্তির বিষয় সম্পর্কে গত ২ অক্টোবর ডিবিসির সাক্ষাৎকারে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘আপস না করলে বেরিয়ে আসলেন কেমনে।

সরকারের কথা শুনেই তো বেরিয়ে এসেছেন।’ একই প্রতিবেদনে বিএনপির সুহৃদ হিসেবে পরিচিত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘কীভাবে উনি রাজি হলেন জানি না। উনাকে জেলেই ফেরত যাওয়া উচিত। এভাবে থাকার ফলে তাকে জনগণ ভুলে যাবে। ’

বিএনপির আরেক ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা আপস করে ফেলেছি নেতাকর্মীরা। নেতারা জেলে যেতে চাই না। কোনও ধরনের নির্যাতন, কষ্ট ভোগ করতে রাজি না। এটাই হচ্ছে বর্তমানের পরিস্থিতি। বেগম জিয়ার মনোবল শক্ত আছে। তিনি দৃঢ় মনোভাবসম্পন্ন। দলের দুর্বলতার কারণে কারাবাস মানতে হচ্ছে।’ হাফিজ উদ্দিন আহমদ আরও বলেন, ‘বিএনপির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নেতা খালেদা জিয়া, তারপর কে জানি না।’

ওই অনুষ্ঠানে দলের ভাইস চেয়ারম্যান শাজাহান ওমর বলেন, ‘তারেক সাহেব থাকেন লন্ডনে। লন্ডনে বসে কথা বলা বা ভাব আদান-প্রদান করা তো ডিফিকাল্ট জব। মাঝে মাঝে তিনি স্কাইপে কথা বলেন। এতে করে পার্টিকে কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। তারেক সাহেব কতখানি চালাতে পারবেন, আপনারাও দেখেন, আমিও দেখি।’ খালেদা জিয়ার প্রসঙ্গে শাজাহান উমরের ভাষ্য ছিল—একজন কনভিক্টেডের কোনও রাজনীতি করার সুযোগ নাই। শত ইচ্ছা থাকলেও বেগম জিয়ার রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ খুবই কম।’

দলের তিন ভাইস চেয়ারম্যানের এসব বক্তব্যের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তারা টেলিভিশনে ইন্টারভিউ দিয়েছেন, আমিও দিয়েছি। তারা যেটা বলেছেন, তা দলের ভেতরে ডেমোক্রেসির চর্চার নমুনা। এটা তারা বলেছেন প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব-নিকাশ আর অসন্তোষ থেকে। অনেকে অনেকভাবে অপ্রাপ্তি প্রকাশ করে, কেউ মিডিয়ায় করে। এতে করে দলের ক্ষতি হচ্ছে বলে মনে করি না।’

খালেদা জিয়ার শর্তসাপেক্ষ মুক্তির বিষয়টি আপসের মাধ্যমে সৃষ্ট কিনা এমন প্রশ্নে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘আপস হলে তাকে আরও অনেক কিছু দিতো, বিদেশ যেতে দিতো। সরকারের কনভিনিয়েন্টের জন্য শর্তসাপেক্ষ মুক্তি দিয়েছে। কোভিডের মধ্যে যদি অ্যাকসিডেন্ট হয়ে যায়, সরকার দায়িত্ব থেকে স্কিপ করে বাড়িতে পাঠিয়েছেন। বেগম জিয়া কোনও কম্প্রোমাইজ করেননি। আপস করলে তো তিনি দলকে বলতেন, তোমরা যাও।’

কিন্তু বিএনপি চেয়ারপারসনের পরিবারের সদস্যরা তো গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন—এ বিষয়ে সাবেক এ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘উনি তো কারও খালা, কারও মা, পরিবারের দরদ বেশি হবে। কিন্তু আমরা তো দেখি রাজনৈতিকভাবে, পলিটিক্যালি উনি তো বলেননি যে যেকোনও শর্তে আমাকে বের করে আনো। তিনি কম্প্রোমাইজ করেননি বলে প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি। মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দিনের সময় থেকে কম্প্রোমাইজ করেননি বলে সি ইজ সাফারিং স্টিল। তার এক ছেলে মারা গেছে, আরেক ছেলে বিদেশে। আর উনি জেলে পচতেছেন।’

বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র মনে করে, দলের ভেতরের যে অংশটি তারেক রহমানকে চাপে ফেলতে চায়, তারা কোনও না কোনোভাবে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। বিগত সময়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে দল ভাঙার বিষয়ে প্রচেষ্টা ছিল। কিন্তু সেটি সফল না হওয়ায় প্রক্রিয়াটি আবারও শুরু হতে পারে। আর শুরুটা হয়েছে সিনিয়র তিন জনকে দিয়ে। বিএনপির তিন জন ভাইস চেয়ারম্যান যেভাবে কথা বলেছেন, তা রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই বলার সুযোগ পেয়েছেন। সামনে তাদের বড় পদ বা সংসদীয় আসনে মনোনয়ন পাওয়ারও সম্ভাবনা প্রায় নেই, এসব চিন্তা থেকেই কারও প্ররোচনায় পড়েছেন তারা।

বিএনপি চেয়ারপারসন অফিসের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্রের দাবি, দলের অভ্যন্তরে তিন নেতার মতো সামনে আরও প্রশ্ন তুলতে পারেন কেউ কেউ, তবে তারা কারা, তা এখনও নিশ্চিত নয় সূত্রটি। আর এ কারণেই বিএনপির হাইকমান্ড বিষয়টি নিয়ে এখনই কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ, কিংবা দলের কোনও কোনও অংশ চাইলেও সিনিয়র তিন নেতার বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন না। সূত্রের এই ভাষ্যের মতো স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদের বক্তব্যেও অনেকটা এমন চিত্রই উঠে আসে। ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘আমি এসব কোনও ম্যাটার মনে করি না। দলের অনেকে অনেক কথা বলবে। শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, মেজর (অব.) হাফিজ, শাহজাহান উমর, তারা মুক্তিযোদ্ধা, সিনিয়র। তারা কোন চিন্তা থেকে এটা বলেছেন, দলের মধ্যেই আলোচনা করলেই পারতেন। তবে তারা বিএনপির আদর্শিক জায়গা থেকে বলেননি, প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি থেকে বলেছেন। তারেক রহমান কার্যকরভাবে দল পরিচালনা করছেন। প্রতিটা মিটিংয়ে আমরা দলের সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।’

সূত্রের দাবি, সিনিয়র তিন নেতা তাদের বক্তব্যের জন্য দলের হাইকমান্ডকে ‘স্যরি’ বলবে না, এমনটিও মনে করছেন কেউ কেউ। বিষয়টি সম্পর্কে বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতারা জানলেও এ বিষয়ে তারেক রহমানের কাছ থেকেই জবাব আসার অপেক্ষায় রয়েছেন দলের কোনও কোনও শক্তিশালী পক্ষ।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এক নেতার সঙ্গে কথা বলার জন্য কয়েকবার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে সম্মত হননি। তিনি বলেন, ‘টেলিফোনে আমি কোনও মন্তব্য করবো না।’ আর ব্যারিস্টার শাজাহান ওমর বাংলা ট্রিবিউনের কাছে সরাসরি অস্বীকার করেন তার বক্তব্যের বিষয়ে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বিকালে তিনি বলেন, ‘আমি তো টকশোতে কিছু বলি নাই। গত চার বছর ধরে কোনও টকশোতেও যাই না।’

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিএনপির নেতৃত্বের কোনও সমস্যা নেই। তারেক রহমান দল পরিচালনা করছেন। এখানে মহাসচিব মির্জা ফখরুল আছেন। নেতৃত্বের সমস্যা তারা দেখছেন—কারণ, তারা বহুদিন ধরে দলের স্থায়ী কমিটিতে আসতে চেয়েছেন। দল ক্ষমতার বাইরে বলে তারা ফ্রাসট্রেশন থেকে এসব কথা বলতে পারেন। ম্যাডাম আপস করবেন কেন, তিনি তো এখনও জেলেই আছেন, তাকে কোনও কার্যক্রম করতে দেওয়া হচ্ছে না।’

জমিরউদ্দিন সরকার জানান, স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এখনও তিন নেতার বিদ্রোহ নিয়ে কোনও আলোচনা হয়নি।সম্প্রতি ডিবিসি চ্যানেল ও দৈনিক ইত্তেফাকে প্রতিবেদনের রেশ ধরে দলে আলোচনা উঠতে পারে আগামী সপ্তাহের বৈঠকে, এমন সম্ভাবনার কথা জানান স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য।

স্থায়ী কমিটির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রবীণ একজন সদস্য বলেন, ‘কিছুদিন আগেও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদকে স্থায়ী কমিটিতে যুক্ত করতে প্রস্তাব দেন জমিরউদ্দিন সরকার। যদিও তারেক রহমান এক-এগারোর সময়ে সংস্কারপন্থীদের ভূমিকা উল্লেখ করেন। পরে জমিরউদ্দিন সরকার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে জানান, যে এক-এগারোর সময় পরিস্থিতির চাপে পড়েই হাফিজ উদ্দিনসহ অনেকেই সংস্কারের পথে গেছেন। পরে বিষয়টি নিয়ে আর কোনও সমাধান আসেনি।’

সূত্র :বাংলা ট্রিবিউন