নেপাল নিয়ে ভারত, তাইওয়ান নিয়ে চীন!

নেপাল নিয়ে ভারত, তাইওয়ান নিয়ে চীন!

বাংলাদেশের কূটনীতিক ভারসাম্য ক্রমশ টলটলায়মান হচ্ছে। একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক অন্য দেশকে উদ্বিগ্ন ও আতঙ্কিত করছে। কিছুদিন আগেও ভারত এবং চীনের সঙ্গে সমান্তরাল সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। বাংলাদেশ চীনের প্রতি অনেকবেশি বন্ধুসুলভ, ব্যবসায়িক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চীনকে অনেক বেশি প্রধান্য দিচ্ছে এরকম অভিযোগ করা হয়েছে ভারতের পক্ষ থেকে।

ভারতীয় গণমাধ্যমে এনিয়ে লেখালেখিও করা হচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্রসচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা করোনার মধ্যেই বাংলাদেশে ছুটে এসেছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরো উষ্ণতার জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য অঙ্গিকার ব্যক্ত করেছিলেন।

কিন্তু বাংলাদেশ- ভারত সম্পর্ক নিয়ে যতই আশাবাদের কথা বলা হোক না কেন, ভেতরে ভেতরে কিছু টানাপোড়েন যে নেই তা অস্বীকার করা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে চীনও বাংলাদেশের অর্থনীতির পার্টনার হওয়ার জন্য আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করেছে। একাধিক প্রকল্পে টাকা দিয়ে চীন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে আরো হৃদ্য করতে চাইছে।

কিন্তু এর মধ্যেই আবার তৃতীয় পক্ষের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। সাম্প্রতিক সময় দুটি ঘটনা বাংলাদেশের প্রধান দুই বড় বন্ধুকে উদ্বিগ্ন, দু:খিত এবং চিন্তিত করেছে। প্রথম ঘটনাটি ঘটেছে গত সপ্তাহে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার ওয়ালটনের মাধ্যমে তাইওয়ান থেকে প্রাপ্ত কিছু স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী গ্রহণ করেছে।

চীন সবসময় তাইওয়ানের ব্যাপারে কঠোর এবং স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সবসময় একচীন নীতিকে সমর্থণ জানিয়ে আসছে। কিন্তু এই করোনার সময় যখন চীনের ভ্যাকসিনের অনুমতি দেওয়া হলো, যখন চীনের চিকিৎসকরা বাংলাদেশে আসলেন-

এমন সময় হঠাৎ করে কিছু ‘খয়ারাতি’ সামগ্রী গ্রহণের জন্য কেন তিন মন্ত্রীকে একসঙ্গে উপস্থিত হতে হলো এ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছে চীন এবং চীন টেলিফোনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এই নিয়ে তাদের দুঃখ প্রকাশ করেছে। কারণ তাদের পররাষ্ট্র নীতির সঙ্গে এই ঘটনা সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

যদিও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে যে, এটা পররাষ্ট্র নীতির কোন বিষয় নয়, এটা শুধুমাত্র একটি মানবিক সাহায্য এবং তাইওয়ানের ব্যাপারে তাদের যে দৃষ্টিভঙ্গি সে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়নি। তবে এই ঘটনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ক্ষুব্ধ করেছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। বিশেষ করে তিন মন্ত্রী মিলিত হয়ে কেন এই ধরণের সামগ্রী নিতে হবে এই প্রশ্ন উঠেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেই এবং সেখানে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তফা জব্বারের কি কাজ, কেন তিনি সেখানে ছিলেন, তিনি তাইওয়ানের এই সামগ্রী গ্রহণের মধ্যস্ততাকারী কিনা এই প্রশ্ন উঠেছে এবং এর ফলে সরকারের মধ্যেও এক ধরণের সমন্বয়হীনতার কথা নতুন করে উচ্চারিত হচ্ছে।

কারণ এই ধরণের জিনিস নেওয়ার ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা দরকার এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত না করে এই ধরণের সামগ্রী কিভাবে নেওয়া হলো তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কাজেই এই বিষয়টি যেন বেশিদূর না গড়ায় সেজন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে বলেও একটি মহল জানিয়েছে।

আর দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটেছে গতকাল। গতকাল নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে টেলিফোন করেন এবং টেলিফোন করে প্রায় টানা ২০ মিনিট কথা বলেন। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত-নেপাল সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে।

নেপাল নতুন মানচিত্র করেছে এবং সেই মানচিত্রে ভারতের অন্তর্গত বেশকিছু এলাকাকে নেপালের বলে দাবি করেছে। একইসাথে নেপাল ভারতের খুঁটি উড়িয়ে দিয়েছে বলেও গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এরকম ভারত-নেপাল সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই কেপি শর্মা অলির শেখ হাসিনাকে টেলিফোন ভারতকে আবার নতুন উদ্বেগের ভেতর ফেলেছে। এমনিতেই বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক ভারতের মাথাব্যথার কারণ।

এর মধ্যে আবার নেপালের সঙ্গে ঘনিষ্টতা, নেপালকে সার সরবরাহ করা এবং দুই প্রধানমন্ত্রীর বিশ মিনিটের টেলিআলাপ ভারতকে নতুন অস্থিরতার মধ্যে ফেলেছে। আর এই দুই বড় দেশের উদ্বেগ একটা বিষয় প্রমাণিত করেছে যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি স্বাধীন, সক্রিয় এবং বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান নিয়েছে। যার ফলে বাংলাদেশের প্রতি সবার এক ধরণের আগ্রহ রয়েছে। সূত্র: বাংলা ইনসাইডার।