প্রশ্নের মুখে ভারতীয় সেনাবাহিনী!

প্রশ্নের মুখে ভারতীয় সেনাবাহিনী!

চীনা কূটনীতিকেরা অভিযোগ করছেন যে ভারতের সম্মুখ রণাঙ্গনের সৈন্যরা হয় চেইন অব কমান্ড লঙ্ঘন করেছেন নয়তো তাদের সিনিয়রদের মাধ্যমে অপব্যবহারের শিকার হয়েছেন।

তারা দাবি করেছেন, ১৫ জুন গালওয়ান ভ্যালিতে ভারতীয় ও চীনা সৈন্যদের মধ্রকার বর্বর সংঘর্ষ ছিল কমান্ড কন্ট্রোলের সামরিক মতবাদ সমুন্নত রাখতে ভারতীয় সেনাবাহিনরি বিহার রেজিমেন্টের ভয়াবহ ব্যর্থতার পরিণতি। এর ফলে কমান্ডিং অফিসার কর্নেল সন্তোস বাবুসহ রেজিমেন্টের ২০ সৈন্য ও অজ্ঞাতসংখ্যক চীনা সৈন্য তাদের জীবন হারায়।

চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র গ্লোবাল টাইমসে ১৭ জুন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ির উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়, ওই ঘটনার তদন্ত খুবই প্রয়োজন। এতে দায়ী ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তি প্রদানের দাবিও জানানো হয়। চীন আরো দাবি জানায়, ভারতের উচিত রণাঙ্গনে থাকা তার সৈন্যদের কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে রাখা।

ওয়াং তার মনোভাব প্রাণঘাতী সংঘর্ষের দু’দিন পর টেলিফোন সংলাপে তার ভারতীয় প্রতিপক্ষ এস জয়শঙ্করকে জানান। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমিত করার জন্য ওই ফোন করা হয়েছিল।একই দিন ভারতীয় মিডিয়ায় ঘটনার তদন্ত ও অপরাধীদের শাস্তি প্রদানের চীনা দাবি নিয়েও প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

গত ১৮ জুন প্রখ্যাত ভারতীয় সাংবাদিক করন থাপার সাথে দি ওয়্যারকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাতকারে চীনে নিযুক্ত সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্রসচিব নিরুপমা রাও রাতের বেলায় চীনা ভূখণ্ডে ভারতীয় সৈন্যদের প্রবেশে বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন।

থাপার যখন তাকে জিজ্ঞাসা করেন যে এই প্রশ্ন ওঠতে পারে কি দিনের বেলায় না করে রাত সাড়ে ৭.৩০টায় অন্ধকারে পার্বত্যপূর্ণ ও বিপজ্জনক একটি এলাকায় চীনা সৈন্যদের প্রত্যাহার করা হয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করার কমান্ডিং অফিসার কর্নেল বাবুর সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল কিনা? এর জবাবে নিরুপমা বলেন, এটি অবশ্যই একটি প্রশ্ন এবং এর জবাব দিতে হবে।

তিনি আরো বলেন, ব্যাটালিয়ন কমান্ডার হিসেবে রাত ৭.৩০-এ চীনা সৈন্যদের প্রত্যাহার যাচাই করার সিদ্ধান্তটি কর্নেল বাবুই নিয়েছিলেন নাকি উচ্চতর পর্যায় থেকে নির্দেশনার আলোকে তিনি তা করেছিলেন, তা অস্পষ্ট।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল এইচ এস পানাগ ১৮ জুন দি প্রিন্টে এক কলামে লিখেছেন, সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থরাই পেশাগত রীতি অনুযায়ী বাহিনী ব্যবহার করতে সরকারকে পরামর্শ দেয়ার পেশাগত দায়দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এসব সৈন্যে রক্ত সরকার ও সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পদে থাকা ব্যক্তিদের হাতে।

অবশ্য, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গালওয়ান সংঘর্ষের পর ২২ জুন প্রথমবারের মতো জাতির উদ্দেশে বক্তৃতায় মৃত সৈন্যদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলেন, ‘দেশ কো ইজ বাত কা গর্ব হোগা কি ভি মারতে মারতে মরে’ (জাতি গর্বের সাথে দেখছে যে তারা তারা শত্রুদের মারতে মারতে মরেছে)।

একইভাবে স্বাধীনতা দিবসের বক্তৃতায় ভারতের রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোভিন্দ বলেন, পুরো জাতি গালওয়ানে নিহতদের সম্মান জানায়… লড়াইয়ে তাদের সাহসিকতা প্রদর্শিত হযেছে। আমরা শান্তিতে বিশ্বাস করলেও আমরা যেকোনো আগ্রাসনের সমুচিত জবাব দিতে সক্ষম।

অবশ্য গালওয়ান সঙ্ঘাতের প্রায় দুই মাস পর ভারতের স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে ভারতে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত সান ওয়ে দং আবারো চীনা অবস্থান তুলে ধরেছেন।

নয়া দিল্লির চীনা দূতাবাসের প্রকাশিত চায়না-ইন্ডিয়া রিভিউ ম্যাগাজিনে তিনি বলেন, আমরা ভারতীয় পক্ষকে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আহ্বান জানাচ্ছি, লঙ্ঘনকারীদের জবাবদিহিতার আনতে বলছি, রণাঙ্গনে থাকা সৈন্যদের কঠোর শৃঙ্খলায় রাখতে বলছি,

এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি নিশ্চিত করতে সব ধরনের উস্কানিমূলক কাজ দ্রুত বন্ধ করার আহ্বান জানাচ্ছি।সবশেষে ভারত সরকার স্বীকার করেছে যে গালওয়ান সংঘর্ষে তাদের সামরিক বাহিনী একটি ভুল করেছে, আর তা কথায় নয়, কাজে।

ভারত প্রতি বছর ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সীমান্ত সুরক্ষায় অনন্য সাহসিকতা প্রদর্শনের জন্য তার সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনীর সৈন্যদের পদক দিয়ে থাকে। গালওয়ান সংঘর্ষে নিহত কোনো সৈন্যকে এবারের পদক তালিকায় রাখা হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, মৃত্যু-পরবর্তী শাস্তি হিসেবে তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির দাবি অনুযায়ী চীনা শত্রুদের হাত থেকে সীমান্ত রক্ষা করতে গিয়ে নিহত ২০ সৈন্যের উচ্চতর পদকে ভূষিত হওয়া ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। কেন তা হলো না তা ভারতের নাগরিকদের উচিত সরকারকে প্রশ্ন করা।

পদক তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ পড়ায় চীনাদের এই দাবিই গুরুত্ব পায় যে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী তাদের সামরিক কমান্ডার ও বেসামরিক নেতাদের অধীনে নেই। ফলে তদন্তের চীনা দাবিটি যৌক্তিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে মনে হচ্ছে।

প্রবল সম্ভাবনা আছে যে ওই কাজটি করার জন্য বিহার রেজিমেন্টকে প্রভাবিত করেছিলেন সিনিয়র সামরিক কমান্ডাররা কিংবা সৈন্যরা তাদের নিজেদের উদ্যোগেই কাজটি করেছিলেন চীনাদের উত্তেজিত করতে কমান্ড কন্ট্রোল লঙ্ঘন করে।

সিনিয়র কমান্ডারদের হাত থাকলে এমন সম্ভাবনা আছে যে তারা অবসরগ্রহণের পর নিজস্ব রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য তা করে থাকতে পারেন। সামরিক কমান্ডাররা এখন ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় ভারতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করছেন।

এই ঘটনা ভারতের ঘরোয়া পরিবেশে ও আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশলিতার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। অনেক পক্ষ ও তাদের যথার্থ প্রতিক্রিয়া এখন কাঙ্ক্ষিত হবে।

প্রথমত, ভারতের করদাতা ও ভোটারদের উচিত হবে এই ঘটনার জন্য সরকারের কাছে জবাব দাবি করা। কারণ ভারত রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্রবিষয়ক সাংবাদিক, কৌশলগত বিশ্লেষক, শিক্ষাবিদ, থিঙ্ক-ট্যাঙ্কগুলোর উচিত হবে তাদের উগ্র স্বাদেশিকতা পাশে সরিয়ে রাখা। তাদেরকে বিচক্ষণতার সাথে কাজ করতে হবে।

কারণ তাদের রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তাদের উচিত হবে তাদের প্রধানমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ, সেনাপ্রধানকে গালওয়ান ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা ও তদন্তের দাবি জানানো।

দ্বিতীয়ত, ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও পাকিস্তানের জন্য এবং এর নিকট প্রতিবেশী- বাংলাদেশ, ভুটান, মিয়ানমার, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার জন্য এটি একটি বিরক্তিকর ইস্যু। এসব দেশের সম্মিলিতভাবে ভারতকে নিশ্চিত করতে বলতে হবে যে তাদের সব বাহিনী সামরিক কমান্ডার ও তাদের বেসামরিক নেতৃত্বের অধীনে রয়েছে।

সবশেষ কথা হলো, ভারতের হাতে আছে পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার ও আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। কমান্ড কন্ট্রোল যদি সামিরক নেতৃত্ব ও তাদের বেসামরিক প্রভুদের হাতে না থাকে, তবে ভারতের পরমাণু ও কৌশলগত অস্ত্রগুলোর অপব্যহার হতে পারে। এ ধরনের ক্ষেত্রে মিউচুয়ালি অ্যাসিউড ডেস্ট্রাকশন (এমএডি) ভবিষ্যতে ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় থাকে।

সূত্র : এশিয়া টাইমস