চীনা ভ্যাকসিন বাংলাদেশে ট্রায়াল: ভারতের পরাজয়?

চীনা ভ্যাকসিন বাংলাদেশে ট্রায়াল: ভারতের পরাজয়?

গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাত্র দেড় মিনিটের মধ্যে ভ্যাকসিন নিয়ে বিতর্কের অবসান করেছেন। চীনা ভ্যাকসিন ট্রায়াল আবেদনের বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দেড় মাসের বেশি সময় ধরে পড়েছিল, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তা একদিনেই সিদ্ধান্তে পরিণত হয়েছে এবং ভ্যাকসিন ট্রায়ালের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

ওষুধ প্রশাসনও আগামী সোমবার তার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেবে, এরপর চীনা ভ্যাকসিনের টিকাগুলো বাংলাদেশে আসবে এবং তাঁরা তাঁদের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে এই ভ্যাকসিন ট্রায়াল দেবে। চীনা কোম্পানি সিনোভ্যাকের এই ভ্যাকসিন ট্রায়ালের বিষয়টি যত যতটা জনস্বাস্থ্যের বিষয়, ততটাই রাজনৈতিক বিষয় বলে মনে করছেন কূটনৈতিক মহল।

বিশেষ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেভাবে ইউটার্ন নিয়েছে তাতে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় শেখ হাসিনার পালস বুঝতে পারেননি। এজন্যই তারা একের পর এক বিভ্রান্তিকর পদক্ষেপ নিয়েছিল এই ভ্যাকসিনের ব্যাপারে। প্রথম কথা হচ্ছে, যখন এই ভ্যাকসিনের জন্য বিএমআরসি’র ইথিক্যাল কমিটির কাছে অনুমোদন চাওয়া হয়, সেটা ছিল সম্পূর্ণভাবে বিএমআরসি’র বিষয়।

অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী বিএমআরসি’র চেয়ারম্যান এবং বিএমআরসি সার্বিক দিক বিবেচনা করে, অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক দিকগুলো পর্যালোচনা করে দেখে যে ট্রায়ালের নৈতিক মানদণ্ডে এটা সঠিক আছে কিনা। বিএমআরসি’র অনুমোদন দেওয়ার পর ওষুধ প্রশাসন এই ভ্যাকসিনটি মানবদেহে প্রয়োগের ফলে কোন নেতিবাচক দিক আছে কিনা সেই ব্যাপারে পর্যালোচনা করে একটি অনুমতি দেয়।

এখানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মতির বিষয়টি একেবারেই গৌণ। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিএমআরসি’র ইথিক্যাল ট্রায়ালের অনুমতি দেওয়ার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হৈচৈ করে বসে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজে এই ধরণের ভ্যাকসিন ট্রায়ালের অনুমতি কিভাবে বিএমআরসি দিয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং তিনি গণমাধ্যমে বলেন যে, সরকার কোন ভ্যাকসিন ট্রায়ালের অনুমতি দেয় নি।

এরপর শীতনিদ্রায় চলে গিয়েছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে চীনা ভ্যাকসিনের ট্রায়াল হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে যে, হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা বাংলাদেশ সফর শেষে চলে যাওয়ার পরপরই চীনা ভ্যাকসিন ট্রায়ালের অনুমতি দেওয়া হলো- এটা কি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং এর ফলে কি চীনের কাছে ভারতের কূটনৈতিক পরাজয় ঘটলো?

এটা কি বাংলাদেশে ভারতের একটি পরাজয়? এই প্রশ্নগুলো উঠছে, আলোচিত হচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন যে, সরকার এটাকে সম্পূর্ণ একটি জনস্বাস্থ্যের বিষয় হিসেবে দেখছে। এখানে জয়-পরাজয়ের কোন বিষয় নেই। সারা বিশ্ব এখন করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করছে। এখানে কে প্রথম, কে দ্বিতীয় তা বিষয় নয়।

বিষয়টি হলো, ভ্যাকসিন উৎপাদনে যার যেটুকু সামর্থ্য আছে তা দিয়ে সহায়তা করা। বাংলাদেশও করোনা আক্রান্ত একটি দেশ, কাজেই বাংলাদেশও করোনা মোকাবেলার জন্যে এই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির তৎপরতায় কেন অংশীদার হবেনা? কেন বাংলাদেশও এই মানবতার কাজ থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখবে?

সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, সরকার যেমন চীনা ভ্যাকসিনের ট্রায়ালের অনুমতি দেবে, তেমনি ভারতের সিরাম কোম্পানি যারা অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন উৎপাদনের দায়িত্ব পেয়েছে তাঁদের ভ্যাকসিনের ট্রায়ালও দেবে। কাজেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির যে মূল বিষয় বস্তু, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়, সকলের সঙ্গে মিত্রতা, তার একটি চমৎকার উদাহরণ হলো এই ভ্যাকসিন ট্রায়ালের জন্যে সব দেশগুলোকেই সুযোগ দেওয়া।

বাংলাদেশ যে একটি মানবিক রাষ্ট্র এবং করোনার ফলে বিশ্ব মানবতার যে সঙ্কট তৈরি হয়েছে তা মোকাবেলায় বাংলাদেশ যে অংশগ্রহণ করছে এবং বাংলাদেশ যে তার যেটুকু ভূমিকা রাখা প্রয়োজন সেটুকু ভূমিকা রাখতে পারছে সেটা প্রমাণিত হলো এই ভ্যাকসিন ট্রায়ালের অনুমতি দিয়ে।

কাজেই যারা এই ভ্যাকসিন ট্রায়ালের অনুমতিকে বিশ্ব কূটনীতির বিষয় হিসেবে দেখছেন বা যারা এটাকে ভারত-চীনের বৈরিতা হিসেবে দেখছেন তাঁরা আসলে এক ধরণের ভুল করছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই ভুল ভেঙে দিলেন মাত্র। তিনি স্পষ্ট বুঝিয়ে দিলেন যে, ভ্যাকসিন কোন রাজনীতির বিষয় নয়, ভ্যাকসিন বিজ্ঞান আর মানবতার বিষয়, স্বাস্থ্যগত বিষয়।

কাজেই বাংলাদেশ ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে কোন প্রকার রাজনীতি বা সংকীর্ণতাকে প্রশ্রয় দেয়না। কাজেই চীনা ভ্যাকসিন ট্রায়ালের ঘটনাকে যারা রাজনৈতিক মোড় দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁরা খুব শীঘ্রই হতাশ হবেন বলে ধারণা করছেন রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। সূত্র: বাংলা ইনসাইডার।