যে কাজগুলো করোনা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করেছে

বাংলাদেশে ক্রমশ করোনা পরিস্থিতি ভ’য়াবহ আকার ধারণ করছে। প্র’তিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে শনাক্তের সংখ্যা। একমাত্র আশাবাদের জায়গা যে মৃত্যু সংখ্যা কম, সেটি নিয়েও আশাবাদী হতে পারছেন না বিশেষজ্ঞরা।

তাঁরা বলছেন যে, যেকোন সময় মৃত্যু সংখ্যাও বাড়তে শুরু করবে। কারণ রোগী বাড়লে গু’রুতর অসুস্থ রোগীর সংখ্যাও বাড়বে। তখন হাসপাতালে জায়গা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে এবং তখন মৃত্যুর সংখ্যা অ’নিবার্যভাবে বাড়বে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতির তিন মাস পূর্ণ হচ্ছে কাল এবং এই তিন মাসে আমরা কিছু ভুল করেছি। কিছু ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, যে সিদ্ধান্তগুলোর কারণে করোনা পরিস্থিতি এখন ভ’য়াবহ হয়ে উঠেছে।

আমরা যদি দেখি যে, করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই বাংলাদেশ কি কি ভুলগুলো করেছে, তাহলে আমাদের পরিস্থিতিটা অনুধাবন করা সহজ হবে।

১. ইতালিসহ ইউরোপ ফেরতদের কোয়ারেন্টাইনে না রাখতে পারা

বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের শুরুই হয় ইতালি ফেরতদের দিয়ে। যখন ইতালিসহ গোটা ইউরোপে করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লো, তখন ইতালি-ইউরোপ থেকে বাংলাদেশিরা দেশে ফেরা শুরু করলো।

ইতালি ফেরতদের প্রথমে আশকোনা হজ্ব ক্যাম্পে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হলেও তাঁরা বিদ্রোহ করে বসে। পরবর্তীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক তাঁদেরকে ‘মুক্ত’ করেন।

এটা ছিল বাংলাদেশে করোনা নিয়ে প্রথম আ’ত্মঘাতী সিদ্ধান্ত এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশে আস্তে আস্তে করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। কারণ তাঁদেরকে বলা হয়েছিল যে তাঁরা হোম কোয়ারেন্টাইন পালন করবেন।

কিন্তু বাস্তবে তাঁরা ঘুরে বেড়িয়েছে, কেউ কেউ বিয়ে করেছে বা দাওয়াত খেয়েছে। এটার কারণে বাংলাদেশের করোনা সংক্রমণ প্রথম ধাপে ছড়িয়ে পড়ে বলে মনে করা হয়।

এখানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতির অভাব ছিল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যদি প্রথম থেকেই তাঁদেরকে বিশেষভাবে আলাদা করে রাখার ব্যবস্থা নিতো, তাহলে পরিস্থিতি খারাপ হতো না।

২. সাধারণ ছুটি দিয়ে প্রথমে গণপরিবহন বন্ধ না করা

মন্ত্রিপরিষদ সচিব সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ২৩ শে মার্চ ঘোষণা করেন যে আগামী ২৬শে মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি। কিন্তু এই ঘোষণা তিনি যখন দিলেন তখন গণপরিবহন বন্ধ করা হলোনা।

ঐদিন রাত থেকেই মানুষ যে যেভাবে পেরেছে গ্রামের বাড়ির দিকে ছুটে চলে গেছে। ফলে ঢাকা থেকে করোনা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং এখানেও করোনা পরিস্থিতির আরেক ধাপ অবনতি ঘটেছে এবং এই সিদ্ধান্তের ফলে সারাদেশে করোনা সংক্রমণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

৩. বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের গার্মেন্টস খোলার সিদ্ধান্ত

৪ এপ্রিল হঠাৎ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গার্মেন্টস খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং সিদ্ধান্তের সাথে সাথে গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজাররা শ্রমিকদেরকে ঢাকায় আসার নির্দেশ দেয়, অন্যথায় চাকরি চলে যাওয়ার হু’মকি দেখানো হয়।

এই সময় লাখ লাখ মানুষ যে যেভাবে পেরেছে ঢাকায় ফেরে এবং এর করোনা সংক্রমণের একটি বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। পরবর্তীতে যখন দ্বিতীয় দফায় গার্মেন্টস খোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় তখন মানুষে আবার এভাবে ফিরেছে এবং আরেক দফায় সংক্রমণের ঝুঁকি ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের পেছনে সবথেকে বেশি দায়ী গার্মেন্টস খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

৪. রোযায় দোকানপাট খুলে দেওয়া

করোনা সংক্রমণ ঠেকানোর ক্ষেত্রে আরেকটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল রোযায় দোকানপাট খুলে দেওয়া। এর মাধ্যমে মানুষকে ঘরবন্দি রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। মানুষ শপিং করা, বাজারহাট করতে বেরিয়ে পড়ে, শিথিল হয়ে পড়ে লকডাউন। ফলে বাংলাদেশে, বিশেষ করে ঢাকায় করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

৫. ঈদের ছুটিতে ঘরে ফেরা

ঈদের ছুটিতে বলা হয়েছিল যে, সকলে সকলের কর্মস্থলে থাকবে, কেউ ঢাকা ত্যাগ করতে পারবে না, ঢাকাকে সিল করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পারেনি সরকার। মানুষ যে যেভাবে পেরেছে ঈদের ছুটিতে ঘরে গেছে এবং আবার ঢাকায় ফিরেছে। এটা সামাজিক সংক্রমণের ক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

৬. পিক সময়ে সবকিছু খুলে দেওয়া

করোনা সংক্রমের সবথেকে বড় আ’ত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছিল পিক সময়ে সবকিছু খুলে দেওয়া। আরো অন্তত ৭ থেকে ১০ দিন সবকিছু বন্ধ রাখা হতো, তাহলে পরিস্থিতিটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যেত বলে মনে করেন অনেকেই। আর এই রকম কাজগুলোর কারণে বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি অনেকটাই ভয়াবহ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।