প্রধানমন্ত্রী বলার পরেও তাদের বাঁচাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নতুন কৌশল!

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠানে কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ১৪টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সুপারিশে এ তালিকা করা হয়েছে। তালিকায় নাম থাকা ১৪ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রণালয়।

কিন্তু মজার বিষয় হলো এই ১৪টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নাম নেই স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির মূলহোতা জেএমআই গ্রুপ এবং ঠিকাদার মিঠুর প্রতিষ্ঠানের। এ যেন স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির মূলহোতাদের বাঁচাবার নতুন কৌশল। কালো তালিকায় চুনোপুঁটিদের নাম রেখে বাদ দেওয়া হয়েছে রাখব বোয়ালদের।

কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) বিদায়ী পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহীদউল্লাহ গত ৩০ মে স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতি নিয়ে লেখা চিঠিতে স্পষ্টভাবেই ঠিকাদার মিঠুর নাম উল্লেখ করেছিলেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা ঠিকাদার মিঠুর সঙ্গে মিলে কোটি কোটি টাকার যে দুর্নীতি করেছিলেন সে বিষয়েও বিস্তারিত জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) বিদায়ী পরিচালক। ঠিকাদার মিঠু বিনা টেন্ডারে কয়েকশ কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিয়েছিল। অথচ কালো তালিকায় এই মিঠুর নাম নেই।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির আরেক হোতা জেএমআই গ্রুপ। এন-৯৫ মাস্কের বদলে সাধারণ মাস্ক সরবরাহ করে দুর্নীতির নতুন নজির স্থাপন করেছেন এই প্রতিষ্ঠানটি।

প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং এই দুর্নীতি নিয়ে কথা বলেছেন। অথচ ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছে এই জেএমআই গ্রুপ। স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতিবাজ ঠিকাদারদের তালিকায় নেই জেএমআই কিংবা এই পরিচালক আব্দুর রাজ্জাকের নাম।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে সেগুলো হলো- স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ও আলোচিত কেরানি আবজাল হোসেনের স্ত্রী রুবিনা খানমের রহমান ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ও রূপা ফ্যাশন।

প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে মেডিকেল সরঞ্জাম ক্রয়সংক্রান্ত এক মামলায় পাঁচ কোটি ৯০ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও ৩১ কোটি ৫০ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের কথা বলা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় করা এক মামলায় সাড়ে ৩৭ কোটি টাকা সরকারি তহবিল আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।

পুরানা পল্টনের আবদুস সাত্তার সরকার ও মো. আহসান হাবীবের মালিকানাধীন মেসার্স মার্কেন্টাইল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, তোপখানা রোডের জাহেরউদ্দিন সরকারের মালিকানাধীন বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল ও

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার আসাদুর রহমানের মালিকানাধীন ইউনিভার্সেল ট্রেড করপোরেশনের বিরুদ্ধে দুদকের খুলনার সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের মামলায় সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ছয় কোটি ছয় লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।

জাহেরউদ্দিন সরকারের মালিকানাধীন বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যালের বিরুদ্ধে রংপুর মেডিকেল কলেজের সাড়ে চার কোটি টাকা ও চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের নামে যন্ত্রপাতি ক্রয়ের নামে নয় কোটি ১৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করেছিল দুদক।

এছাড়াও তালিকায় আছে- চট্টগ্রামে দুর্নীতির অভিযোগে মুন্সী ফররুখ হোসাইনের মেসার্স আহমেদ এন্টারপ্রাইজ, বেঙ্গল সাইন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল কোং ও এর স্বত্বাধিকারী মো. জাহের উদ্দিন সরকার এবং এএসএল ও প্রতিষ্ঠানটির এমডি আফতাব আহমেদ।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কেনাকাটায় অনিয়মের মাধ্যমে ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ঢাকার মিরপুরের আবদুল্লাহ আল মামুনের মালিকানাধীন অনিক ট্রেডার্স ও মুন্সী ফররুখ হোসাইনের মেসার্স আহমেদ এন্টারপ্রাইজ।

বিনা টেন্ডারে সাড়ে নয় কোটি টাকারও বেশি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে রংপুরের মনজুর আহমেদের মালিকানাধীন মেসার্স ম্যানিলা এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স এসকে ট্রেডার্স,

মোসাদ্দেক হোসেনের মালিকানাধীন এমএইচ ফার্মা, জয়নাল আবেদীনের মালিকানাধীন মেসার্স অভি ড্রাগস, আলমগীর হোসেনের মালিকানাধীন মেসার্স আলবিরা ফার্মেসি ও মো. মিন্টুর মালিকানাধীন এসএম ট্রেডার্স ও ঢাকার মোকছেদুল ইসলামের মালিকানাধীন বেয়ার এভিয়েশন।

প্রশ্ন হলো, স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতির মূলহোতা যেই ঠিকাদাররা, তাদের বাদ দিয়ে কালো তালিকা করার উদ্দেশ্যটা কী? রাঘব বোয়ালদের বাদ দিয়ে চুনোপুঁটিদের তালিকায় আনাটা একটা আইওয়াশ? এটা কি দুর্নীতিবাজ ঠিকাদারির মূল হোতাদের বাঁচিয়ে দেওয়ারই কৌশল নয়?

সূত্র :বাংলা ইনসাইডার