কেন তারা ব্যর্থ হচ্ছেন

বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর আমলাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সরকারের নীতিনির্ধারকরা আমলাদেরকেই মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহৃত করেছিল এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দদেরকে সাইডলাইনে বসিয়ে দিয়েছিল।

কিন্তু প্রায় ৩ মাস পর সরকার তাঁর কৌশল পরিবর্তন করছে বলে মনে হচ্ছে। ক্রমশ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ চালকের আসনে বসছে এবং আমলারা সাইডলাইনে চলে যাচ্ছে। এই পরিবর্তন কেন?

আমলাদেরকে যখন কর্তৃত্বে আনা হয়েছিল, তখন আমলারা কেন দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলেন এই নিয়ে বিশ্লেষকরা নানারকম মতামত দিচ্ছেন। উল্লেখ্য যে, করোনা মোকাবেলার জন্য সরকার তিন ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। প্রথমত, জনস্বাস্থ্যের সঙ্কট মোকাবেলা, দ্বিতীয়ত অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলা, তৃতীয়ত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকা নিশ্চিত করা।

আর এটা করতে গিয়ে প্রতিটি জেলার তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল জেলা প্রশাসকদের। আর জেলার তদারকির জন্য একজন সচিবকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আমলারাই করোনা মোকাবেলার পদ্ধতিগত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন। কিন্তু প্রায় ৩ মাস অতিবাহিত হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে যে, আমলাদের অনেক সিদ্ধান্তই ভুল, অনেক সিদ্ধান্তই পরস্পরবিরোধী, সমন্বয়হীণ।

আর একারণেই আমলাদের কাছ থেকে ক্রমশ সরে আসছে সরকারপ্রধান এবং গতকাল করোনা মোকাবেলায় কারিগরি কমিটির সাথে অনুষ্ঠিত হওয়া এক বৈঠকে তিনি করোনা মোকাবেলায় জনপ্রতিনিধিদের সংযুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন। কেন আমলারা ব্যর্থ হচ্ছেন বা কেন এই করোনা মোকাবেলায় আমলাদেরকে যে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, সেই সুযোগ তাঁরা কাজে লাগাতে পারেনি? এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে পাঁচটি কারণ পাওয়া গেছে।

১. আমলাদের জনসম্পৃক্ততার অভাব

প্রতিটি জেলার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল জেলা প্রশাসকদের এবং এই জেলা প্রশাসকরা জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে দুঃস্থ মানুষদের তালিকা তৈরি এবং তাঁদেরকে ত্রাণ সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু দেখা গেছে যে, জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের জনসম্পৃক্ততা নেই আর

এই তালিকা তৈরি করতে গিয়ে তাঁরা লেজেগোবরে করে ফেলেছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জনপ্রতিনিধিদের উপর নির্ভরশীল হয়ে গেছেন। আর জনপ্রতিনিধিরা সঠিক তালিকা দিচ্ছে কিনা তা যাচাইবাছাইয়ের অবস্থাও তাঁদের ছিলনা। একারণে কর্মহীন মানুষ থেকে শুরু করে দুঃস্থদের যে তালিকা তৈরি করা হয়েছিল তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে।

২. বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন

করোনা সঙ্কটের শুরু থেকেই দেখা গেছে যে, আমলারা একের পর এক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন। ২৬শে মার্চ থেকে যে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল, যেই ছুটি ঘোষনার সময় গণপরিবহন বন্ধের নিষেধাজ্ঞা ছিলনা। আবার যখন দেখা গেছে যে, মানুষ হুটহাট স্রোতের মতো ঢাকার বাইরে চলে যাচ্ছে তখন গণপরিবহনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলো,

কিন্তু ততক্ষণে যা সর্বনাশ হওয়ার তা হয়েই গিয়েছিল। সর্বশেষ যে ছুটি প্রত্যাহার করার চিঠি দেয়া হয়েছিল তাতেও তিনবার সংশোধন করা হয়েছিল এবং চিঠিটার মধ্যেও ছিল নানারকম ভুল। ঐ চিঠির প্রথমে গণপরিবহন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে আবার প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গণপরিবহন চালু করা হয়। এই রকম একের পর এক অসঙ্গতি এবং সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণে আমলারা এরকম সমস্যা মোকাবেলার জন্য নিজেরা কতটুক প্রস্তুত সেই প্রশ্ন উঠেছে।

৩. সিদ্ধান্তে পরিকল্পনার অভাব

আমলারা যখন দায়িত্বে ছিলেন তখন তাঁরা যে সিদ্ধান্তগুলো নিচ্ছিলেন, সেই সিদ্ধান্তগুলোতে পরিকল্পনার অভাব ছিল লক্ষ্যনীয় এবং একটি সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া কি হবে বা কি পরিণাম হবে সেই সমস্ত চিন্তাভাবনার অভাব প্রকটভাবে ফুটে উঠেছিল প্রতিটি সিদ্ধান্তে।

৪. সমস্যার গভীরে যাচ্ছিলেন না

দেখা যাচ্ছে যে, আমলারা যেকোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সমস্যার গভীর পর্যন্ত যাচ্ছিলেন না। যেমন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো গার্মেন্টস খুলে দেওয়ার। কিন্তু গার্মেন্টস খুলে দেওয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কি হবে সেই বিষয়ে চিন্তাভাবনা করেনি। এমনকি ঈদের আগে যখন দোকানপাটগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, সেই সিদ্ধান্তের ফলাফল কি হবে তা নিয়েও খুব একটা চিন্তাভাবনা ছিল বলে মনে হয়না।

৫. খুশী করার প্রতিযোগিতা

আমলারা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনটা জনগণের জন্য কল্যাণকর বা কোনটা দেশের জন্য মঙ্গলজনক সেই ভাবনার চেয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকরা কোন সিদ্ধান্তে বেশি খুশী হবেন সেই ভাবনাতেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন। আর এই কারণেই দেখা গেছে যে, সিদ্ধান্তগুলো ছিল পরস্পরবিরোধী, সিদ্ধান্তগুলোতে জনগণের কল্যাণ হয়নি। বরং এই সিদ্ধান্তে জনগণের ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। যেমন ঈদের আগে যখন লোকজনকে বাড়ি যাওয়ার জন্য সুযোগ করে দেওয়া হলো, তখন গণপরিবহন বন্ধ করে দেওয়া হলো। আবার ঈদের পরে যখন লোকজন ঢাকা ফেরা শুরু করলো, তখনো গণপরিবহন বন্ধ থাকলো। এরকম একের পর এক সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে জনকল্যাণের বিষয়টি যেন উপেক্ষিত ছিল বারবার।

বাংলা ইনসাইডার