হাজারীকে আ. লীগের উপদেষ্টা করার রহস্য ভেদ!

হাজারীকে আ. লীগের উপদেষ্টা করার রহস্য ভেদ!

এক বনে দুই বাঘ থাকলেই অসুবিধা। চলে ডুয়েল লড়ায়ের মত খেলা। যার পরিণতি একজনের চরম পরাজয়, অন্যজনের বিজয়-উল্লাস। ফেনি ছিল দুই বাঘের এলাকা। ফেনি ১ এ বেগম খালেদা জিয়া আর ফেনি ২ এ জয়নাল হাজারী। এটা কোনভাবেই খালেদা জিয়া ও তাঁর চামচারা সহ্য করতে পারেন নি। এছাড়া ‘বাবু যত বলে পারিষদ দলে বলে তার শতগুণ’।

খালেদা জিয়ার আশেপাশের চামচারা জয়নাল হাজারীকে বেগম খালেদা জিয়ার প্যারালাল দাঁড় করিয়ে তাকে চরমভাবে খেপিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ শুধু ১৯৮৬ নয় ১৯৯১ সালে সবাইকে অবাক করে বিএনপি নির্বাচনে বহু বাঘা বাঘ নেতাকে পরাজিত করতে পারলেও জয়নাল হাজারীকে পরাজিত করতে পারেন নি। এমন কি ১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও হাজারি ফেনি ২ থেকে নির্বাচিত হয়ে যান। তাই এটা ছিল বিএনপি-জামায়াতের মুখে চপেটাঘাত। তাই তারা সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন।

এর পরে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার।তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে বিচারপতি লতিফুর রহমান বঙ্গভবনে শপথ গ্রহণের পর মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে বলা নেই কওয়া নেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ কর্মকর্তাদের টর্নেডো স্টাইলে একাধারে বদলি ও অবসরে পাঠানো শুরু করে দিয়েছিলেন। আচমকা উন্মত্ত বেগে হঠাৎ ধেয়ে এসেছিল এই বদলি ঝড়। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সোলায়মান চৌধুরীকে শর্ত সাপেক্ষে ফেনীর জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

যোগদান করার শর্তানুযায়ী সোলায়মান চৌধুরী ১৬ আগস্ট ভোর রাতে অর্থাৎ ১৭ আগস্ট ২০০১ সালে ফেনীর তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক জয়নাল হাজারীর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ `অ’স্ত্র গোলাবারুদ উদ্ধারের নাটক করে। বহুল প্রচারিত বামাতি আর জামাতি পত্রিকায় ব্যাপক প্রচার চালিয়ে জয়নাল হাজারিকে গডফাদার তকমা দেওয়া হয়। জয়নাল হাজারীর বিরুদ্ধে হ’ত্যাসহ বহু মামলা দেওয়া হয়।

আগাম খবর পেয়ে অন্যত্র সরে থেকে পরে জয়নাল হাজারী পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে জয়নাল হাজারী ডিসি সোলায়মান চৌধুরীকে জামায়াত নেতা হিসেবে আখ্যায়িত করলেও প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। তাঁর কথা কেউ শোনেন নি। কারণ তখন সোশ্যাল মিডিয়া এত জনপ্রিয় ছিল না। দেশের বহুল প্রচারিত বামাতি দৈনিক আর জামায়াতের পত্রিকা মিলে জয়নাল হাজারীর বিরুদ্ধে এমন লেখালেখি শুরু করে যে, তাঁর অবস্থা হয় ‘দশে চক্রে ভগবান ভুত’এর মত। হাজারী হয়ে পড়েন গড ফাদার।

এঁর পিছনে বিএনপি জামায়াত সরকারের কাছে বহু নগদ নজরানা পায় ঐ সব বামাতি- জামাতি পত্রিকা আর তাঁদের সম্পাদকগণ। ডিসি হিসেবে সোলায়মান চৌধুরীর প্রায় দুই বছরের কর্মকালীন সময়টি ফেনীর জনপদে সোলায়মানী শাসন ও তিনি সোলায়মান বাদশা নামে পরিচিতি পান। ২০০২ সালে বিএনপির চেয়ার পার্সন বেগম খালেদা জিয়ার অনুজ সাঈদ এস্কান্দরের সাথে বিরোধে জড়িয়ে বদলী হন।

এবার দেখে নেওয়া যাক কে এই সোলায়মান চৌধুরী? তিনি ১৯৬৪ সালে ইসলামী ছাত্র সংঘে যোগ দিয়ে ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে ছাত্রজীবন সমাপ্ত হলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান। ১৯৭৭ সালে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বিষয়ক সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। সোলায়মান চৌধুরী ১৯৭৯ সালে সহকারী কমিশনার ও ম্যাজিস্ট্রেট পদে ঢাকা জেলায় সরকারি চাকুরীতে যোগদান করেন।

ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সচিব, পাটকল সংস্থার চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম ওয়াসা চেয়ারম্যান, জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান, রাষ্ট্রপতির সচিবসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ২০০১ সালে ফেনীর সফল (!) জেলা প্রশাসক হবার পুরষ্কার হিসেবে মাত্র ৪ বছরে তিনি সচিব হয়ে যান। ২০০৬ সালে পর তিনি সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও সর্বশেষ রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান পদ থেকে তিনি অবসরে যান। ১৯৭৯ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রকাশ্য রাজনীতি না করলেও চাকুরী শেষে তিনি বিশেষ এজেণ্ডা নিয়ে বিএনপির চেয়ার পার্সন বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবেও কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৯ সালে পুনরায় তিনি তাঁর পুরাতন রাজনৈতিক জায়গা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরার সদস্য এবং দলের পেশাজীবীদের সংগঠন জাতীয় পেশাজীবী ফোরামের সভাপতির দায়িত্ব পান। হাজারীর দাবি সত্য হবার পরে, ২০০৯ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর তিনি ভারত থেকে দেশে ফিরে আসেন এবং আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। পরে অবস্থা বেগতিক দেখে ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ সালে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে পদত্যাগ করেন।

এখানে জেনে রাখা ভাল যে, ২০০১ সালের সেই চিত্রনাট্য অনুযায়ী বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হবার মুহূর্তের মধ্যে চরম অসৌজন্যতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে তার বাসস্থল গণভবনের টেলিফোন ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের ঘটনা ঘটে। সবাই জানেন বরং হাসিনা সময় শেষ হবার আগে আগেই বঙ্গভবনে উপস্থিত হয়ে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের কাছে সানন্দে তার পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে এসেছিলেন। এতে বিএনপি- জামায়াতের ভেতরে জন্ম নেয়া অযৌক্তিক অশালীন ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল সেদিককার নাটকে। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত রাজত্বকালে নির্বাচন কর্মকর্তা পদে ৩২০ জন ছাত্রদল-শিবির ক্যাডারকে চাকরি দেয়া হয়েছিল। তারা এখন বহাল আছে, আর নির্বাচন নিয়ে নানা মিথ্যা তথ্যের লিখিত দলিল পাচার করে সরকারকে বিব্রত করে চলেছে।

দীর্ঘ দিন ক্ষমতায় থেকে এসব তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা ২০০১ সালের সকল ষড়যন্ত্রের দালিলিক প্রমাণ পেয়ে যান। এর পরেই তিনি জয়নাল হাজারীর উপর যে অবিচার হয়েছে, আর তাঁর ত্যাগের মূল্যায়ন হিসেবে অক্টোবর ২০১৯ তারিখে জয়নাল হাজারিকে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য করেন।

এই খবর বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় বিভিন্নভাবে আসে। বামাতি, জামাতী পত্রিকায়, তাঁদের পালিত বুদ্ধিজীবীগণের লেখায় জয়নাল হাজারির ফিরে আসার খবরকে নেগেটিভ টোনে প্রচার করা হয়। কারণ জয়নাল হাজারী একটু বদরাগী বা বদমেজাজি টাইপের মানুষ হলেও তাকে বামাতি, জামাতি পত্রিকায় যে ভয়ংকর ইমেজ দিয়েছে আসলে তিনি সেই মাপের জঘন্য গডফাদার নন। তাই নানা অপকর্মের নায়ক জামায়াত নেতা ও সাবেক আমলা সোলায়মান চৌধুরীর রাজনৈতিক দল গঠন নিয়ে তথাকথিত দেশপ্রেমিকরা সবাই মুখে কুলুপ এঁটেছেন। কারণ তারা আন্তরিকভাবে প্রত্যাশা করেন যে, সরকার করোনা মোকাবিলায় ব্যর্থ হলে জামাতি- বামাতি ক্যাডার দিয়ে গুলেন মুভমেন্টের স্টাইলে আন্দোলন করে সরকারের পরিবর্তন করা যায় কি না! এই করোনা কালে দলের রেজিস্ট্রেশন, কর্মকাণ্ডের অনুমতি পাবেনা জেনেও বৈশ্বিক এই দুর্যোগের মাঝে তারা দল গঠন করে,কত আশাবাদী আর দুঃসাহসী তারা, ভাবা যায়!