সরকারের ওপর কি আস্থা হারাচ্ছে জনগণ?

সরকারের ওপর কি আস্থা হারাচ্ছে জনগণ?

করোনা মোকাবেলায় সরকার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। এই চ্যালেঞ্জটি শুধু জনস্বাস্থ্যের চ্যালেঞ্জ নয়, একাধারে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও বটে। এই চ্যালেঞ্জ যদি সরকার মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে শুধু সরকারের ক্ষতি নয়, সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এদেশের জনগণ, বিপর্যস্ত হবে সাধারণ মানুষ। কাজেই এই লড়াইয়ে সরকারকে জিততেই হবে।

আর করোনা মোকাবেলার এই লড়াইয়ে জিততে হলে সরকারকে সাধারণ সাধারণ মানুষের আস্থা জয় করতে হবে, সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে। সাধারণ মানুষ যদি করোনা মোকাবেলায় সরকারের সাথে একাত্ব হয়ে কাজ না করে, তাহলে এই লড়াইয়ে জয়ী হওয়া অত্যন্ত কঠিন।

বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের শুরু হয়েছিল ৮ই মার্চ থেকে এবং আমরা সেই করোনা সংক্রমণের দুই মাস পার করতে যাচ্ছি। এই দুই মাসের মধ্যে সরকার অনেককিছু করেছে, আবার অনেককিছু করতে পারেনি। সরকার করোনা মোকাবেলার কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, আবার সরকারের কিছু ব্যর্থতাও রয়েছে।

কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে একটি গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে যে, টানা চার মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর জনগণের যে আস্থা, বিশ্বাস ছিল সেখানে একটি ভাটার টান পড়েছে করোনা পরস্থিতির কারণে। বিশেষ করে দ্বিতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর যে জনআস্থা তৈরি হয়েছিল এবং শেখ হাসিনার ওপর যে মানুষের আশাবাদ জেগেছিল- সেই আশাবাদের জায়গায় কি কোন ফাটল পড়েছে?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শেখ হাসিনার ওপর এখনো মানুষের আস্থা আছে, তবে সরকারের ওপর আস্থা নিয়ে জনগণের মাঝে ভাটা পড়েছে। এর কারণ হলো জনগণ মনে করছে যে, সরকার করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে যা যা করার দরকার ছিল তা সবকিছু করতে পারেনি। শুধু সাধারণ মানুষ নয়,

এমনকি আওয়ামী লীগের মাঝেও এমন গুঞ্জন শোনা যায় যে সরকার চাইলে আরো অনেক কিছু করতে পারতো, যেগুলো করেনি। কেন করেনি সেটা অন্য বিষয়। তবে এখন পর্যন্ত জনগণের আস্থা পুরোপুরি নষ্ট হয়নি, তবে আস্থার যে সঙ্কট তৈরি হয়েছে এবং মানুষের মাঝে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। কেন এই আস্থার সঙ্কট তৈরি হলো বা জনগণ কেন আস্থা রাখতে পারছে না? এর কারনগুলো যদি বিশ্লেষণ করা যায় তাহলে দেখা যায়-

১ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ বাস্তবায়ন হচ্ছেনা

করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতা, স্বদিচ্ছা এবং রাজনৈতিক দুরদর্শীতা নিয়ে দেশের ৯০ ভাগ জনগণের কোন সংশয় নেই। কিন্তু সাধারণ মানুষ, এমনকি সরকারপন্থিরাও লক্ষ্য করছেন যে, প্রধানমন্ত্রীর যে নির্দেশগুলো তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছেনা। প্রধানমন্ত্রী যা বলছেন তা প্রতিপালিত হচ্ছেনা মাঠ পর্যায়ে। এরকম উদাহরণ বহু দেওয়া যায়। বরং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ বাস্তবায়ন না করে তাঁকে ভুল তথ্য দিয়ে সন্তুষ্ট করার প্রবণতা ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

২. স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কার্যকলাপে সাধারণ মানুষ বিরক্ত

করোনা মোকাবেলার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি স্বস্তির এবং জনবান্ধব সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। বরং তাঁদের একেকটি সিদ্ধান্ত এত লাগামছাড়া, দায়িত্বহীন যে সাধারণ মানুষ বিরক্ত হয়ছে। হোম কোয়ারেন্টাইন থেকে শুরু করে পিপিই সঙ্কট, মাস্ক কেলেঙ্কারি, করোনার বিশেষায়িত হাসপাতালের দুরবস্থা- সবকিছু মিলিয়ে মানুষ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না।

৩. একের পর এক স্ববিরোধী সিদ্ধান্তে মানুষ হতবাক

করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে সরকার অনেকগুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার অনেকগুলোই স্ববিরোধী। ছুটি দিয়ে গার্মেন্টস খোলা, শপিং মল খুলে দেয়া- এরকম একের পর এক স্ববিরোধী সিদ্ধান্তে মানুষ হতবাক হয়েছে এবং মানুষের মাঝে আস্থার সঙ্কট দেখা গেছে।

৪. ত্রাণ নিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ

ত্রাণ নিয়ে প্রথম দিকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কেলেঙ্কারি, অনিয়ম দূর্নীতি। আবার ত্রাণের সহজলভ্যতা, ত্রাণ নিয়ে মানুষের মাঝে নানারকম অসন্তোষ, বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হতাশা সরকারের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি করেছে বলে জানা গেছে।

৫. শেখ হাসিনাকে ঘিরে রেখেছে চাটুকার এবং স্তাবকরা

সাধারণ মানুষ মনে করছে যে শেখ হাসিনা অন্যান্য সময় সঙ্কটগুলো যেভাবে মোকাবেলা করেছেন তাঁর সাথে একটি ভালো টিম ছিল, চারপাশে যারা ছিল সবাই দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেছেন এবং শেখ হাসিনা যেভাবে চেয়েছেন সেভাবেই কাজ করতে পেরেছেন।

কিন্তু এখন শেখ হাসিনাকে ঘিরে রেখেছে কিছু চাটুকার এবং স্তাবকরা। যারা আসলে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষা তাঁরা ধারণ করতে পারছেন না। শেখ হাসিনা যেমন জনগণের কথা বোঝেন, ভাষা বোঝেন, সেরকম তাঁরা বুঝছেন না এবং এরাই আসলে সরকারকে আস্থাহীনতার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ঠেলে দিচ্ছে।