ভ’য়ংকর ম’হামারীর মহাসড়কে বাংলাদেশ

ভ’য়ংকর ম’হামারীর মহাসড়কে বাংলাদেশ

করোনা নিয়ে প্রতিদিন যে তথ্য উপাত্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে তাদের নিয়মিত বুলেটিনে দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে এখন করোনা ম’হামারী শুরু হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ভ’য়ংকর ম’হামারীর মহাসড়কে উঠেছে। পরিস্থিতি ক্রমশ আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

এর পেছনের কারণ বিশ্লেষণ করার আগে যদি আমরা দেখি, বাংলাদেশে আজ সর্বোচ্চ সংখ্যক করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। ৬ হাজার ২৬০ জনের পরীক্ষা করে ৬৮৮ জনের করোনা সংক্রমণ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ যাদের পরীক্ষা করা হয়েছে, তাদের মধ্যে শতকরা ১১ ভাগের মধ্যেই করোনা সংক্রমণ পাওয়া গেছে। এ পর্যন্ত মোট পরীক্ষা করা হয়েছে, ৮৭ হাজার ৬৯৪ জনের নমুনা। তার মধ্যে আক্রান্ত পাওয়া গেছে ১০ হাজার ১৪৩ জন। অর্থাৎ ১১.৫৬ হারে বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ পাওয়া গেছে।

যারা প্রভাবশালী, যারা জরুরী কাজে সম্পৃক্ত বা যারা করোনা রোগীর সংস্পর্শে এসেছেন বলে সরাসরি প্রমাণ পাওয়া গেছে তাদেরকেই শুধু পরীক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু উপসর্গ নিয়ে হাজার হাজার মানুষ পরীক্ষার জন্য ধর্না দিচ্ছে, তাদের পরীক্ষা করা হচ্ছে না। এটিই হলো পরিস্থিতি অবনতির সবচেয়ে বড় লক্ষণ বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রশ্ন হচ্ছে যে, কেন বাংলাদেশে ম’হামারীর শঙ্কা দেখা দিয়েছে এবং কেন বলা হচ্ছে যে, বাংলাদেশ ম’হামারীর মহাসড়কে চলে যাবে? এ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন কারণ দেখিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে-

প্রথমত; সংক্রমণের ট্রেন্ড

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে যদি করোনা সংক্রমণের ট্রেন্ডটা দেখা হয় তাহলে দেখা যাবে যে, টানা ৭ দিন ৫০০ এর উপর সংক্রমণ হয়েছে। আমরা যদি ২৮ এপ্রিল থেকে এই করোনা সংক্রমণের হারটি দেখি, তাহলে দেখব যে, ৫৪৯ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল ২৮ এপ্রিল। সেখান থেকে প্রতিদিনই এই রোগীর সংখ্যা একই রকমভাবে কম বেশি হয়েছে।

৭ দিনে আজ সর্বোচ্চ সংখ্যক ৬৮৮ জন শনাক্ত হলো। ২৮ এপ্রিল ৫৪৯ জন, ২৯ এপ্রিল ৬৪১ জন, ৩০ এপ্রিল ৫৩৪ জন। ১ মে ৫৭১ জন, ২ মে ৫৫২ জন, ৩ মে ৬৬৫ জন এবং আজ ৬৮৮ জন শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ এই সীমিত পরীক্ষার মধ্যে সংক্রমণের যে উল্লম্ফন এবং একইভাবে স্থিতিশীল থাকা তা প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ এখন মহামারীতে প্রবেশ করেছে।

দ্বিতীয়ত; সামাজিক সংক্রমণের সুযোগ সৃষ্টি

বিশেষজ্ঞরা দ্বিতীয় কারণ বলছেন যে, সামাজিক সংক্রমণের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। গার্মেন্টসগুলো খুলে গেছে। অন্যান্য কলকারাখানা এবং অফিস আদালতও খুলে গেছে। অফিস আদালত এবং অন্যান্য জায়গায় করোনা সংক্রমণের ব্যাপারে কিছু বিধি নিষেধ মানা হলেও গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে এখন পর্যন্ত যে পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, তাতে কিছুই মানা হচ্ছে না। এখানে করোনার বিস্ফোরণের একটা শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। কারণ গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলোতে এমন অবস্থা যে এখানে একজন করোনা সংক্রমিত হলে হাজার হাজার সংক্রমণের সুযোগ তৈরি হয়ে যাচ্ছে।

তৃতীয়ত; পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা

তৃতীয় যে কারণে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে বাংলাদেশ ম’হামারীর মহাসড়কে উঠে গেছে তা হলো পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা। এখন পর্যন্ত যে সংখ্যক মানুষ পরীক্ষা করাতে চাচ্ছে এবং উপসর্গের কথা বলছে, তার এক দশমাংশও পরীক্ষার আওতায় আসছে না। যার ফলে একটা উপসর্গ নিয়ে বা উপসর্গহীন বিপুলসংখ্যক মানুষ সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে, ঘুরে বেরাচ্ছে এবং সামাজিক সংক্রমণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এটিও ম’হামারী সংক্রমণের একটি বড় কারণ বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

চতুর্থত; অপ্রতুল চিকিৎসা ব্যবস্থা

করোনার চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনও বাংলাদেশে অপ্রতুল এবং উল্লেখ করার মতো কিছুই নেই। কাজেই অসুস্থ হলেই মৃত্যু হতে পারে। বেশি রোগীকে নেওয়ার মতো সক্ষমতা আমাদের নেই। কাজেই রোগী যখন বেশি শনাক্ত হবে তখন হাসপাতাল ভিত্তিক চিকিৎসা দিতে ব্যর্থ হবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এর ফলে একটা অসহনীয় পরিস্থিতি তৈরি হবে।

পঞ্চমত; সুস্থতার নতুন তত্ত্বের বিপত্তি

করোনার সুস্থতা সম্পর্কে নতুন গাইডলাইন দেওয়া হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে যে, তিনদিন জ্বর না থাকলেই যে করোনা রোগী তাকে সুস্থ বলা হবে। তাকে সার্টিফিকেট দিয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হবে। এর ফলে একটা ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। কারণ তিনদিন জ্বর না থাকলেও ভেতরে উপসর্গ এবং জীবাণু থাকলে তিনি করোনার একজন ক্যারিয়ার হিসেবে সমাজে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারেন।

কাজেই এই সামগ্রিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে আমাদের করোনা পরিস্থিতি যেভাবে মোকাবেলা করার কথা বা যেভাবে মোকাবেলা করা উচিত তা আমরা করতে পারিনি বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এর ফলে, আমরা একটা ম’হামারীর মহাসড়কে উঠে গেছি। আমাদের এই অন্ধকার বন্ধুর যাত্রাপথ কোথায় শেষ হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।