ভ’য়াবহ চ্যালেঞ্জের মুখে আওয়ামী লীগ!

টানা তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। তৃতীয় মেয়াদে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছে। কিন্তু ১ বছর যেতে না যেতেই আওয়ামী লীগের তৃতীয় মেয়াদের সরকার পরিচালনা যেন অস্বস্তিকর অবস্থায় পৌঁছেছে। আওয়ামী লীগ প্রথম এবং দ্বিতীয় মেয়াদে যেভাবে সাফল্য, জনপ্রিয়তা এবং জনআস্থা নিয়ে দেশ পরিচালনা করেছিল,

তৃতীয় মেয়াদে এসে সেক্ষেত্রে কিছু ভাটার টান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাম্প্রতিক করোনা পরিস্থিতি। অথচ এই সময়টাই আওয়ামী লীগের সবথেকে বেশি উদযাপন করে দেশ পরিচালনার কথা ছিল। কারণ ১৭ মার্চ থেকে মুজিববর্ষ শুরু হয়েছিল এবং সেটা নিয়ে বছর ব্যাপী নানা রকম অনুষ্ঠান, কর্মসূচী আয়োজনের কথা ছিল।

একটা উৎসবমুখর পরিস্থিতিতে যখন আওয়ামী লীগের দেশ পরিচালনার কথা, তখন এক কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে। করোনার কারণে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে সব পরিকল্পনা, এক কঠিন ঝুঁকির মুখে পড়েছে জনস্বাস্থ্য, জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অর্থনৈতিক সঙ্কট ডালপালা মেলছে।

আর এতে জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক সঙ্কট রাজনৈতিকভাবে চেপে ধরেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে; আওয়ামী লীগ সরকার এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। আওয়ামী লীগের সামনে অনেকগুলো সঙ্কট দেখা যাচ্ছে, যে সঙ্কটগুলো মোকাবেলা করেই তাঁদের টিকে থাকতে হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মোটা দাগে প্রধান পাঁচটি চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছেন। এই চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে-

১. নেতারা করণীয় জানেন না

করোনা সঙ্কট মোকাবেলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের করণীয় কি তা অধিকাংশ নেতাকর্মীরাই জানেন না। কিছু কিছু নেতারা নিজ উদ্যোগে যা পারছেন তাই করছেন। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোন নির্দেশনা নেই, সুনির্দিষ্ট কোন গাইডলাইন নেই। এমনকি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি বা প্রেসিডিয়াম কমিটির নীতিনির্ধারনী কোন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি। তাই অধিকাংশ নেতারাই জানেন না তাঁদের কি করতে হবে।

২. সরকারে দলের ভূমিকা খর্ব

করোনা সঙ্কটে স্পষ্টতই আওয়ামী লীগের ভূমিকা খর্ব করা হয়েছে। নেতাদেরকে বাদ দিয়ে বরং সামনে এনে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আমলাদেরকে। জেলার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আমলাদেরকে, স্থানীয় পর্যায়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে জেলা প্রশাসকদেরকে। ফলে আওয়ামী লীগ কোথাও নেই, আওয়ামী লীগ তাঁর নিজস্ব উদ্যোগে ত্রাণ দিচ্ছে, নিজস্ব উদ্যোগে ধান কাটছে। কিন্তু সরকারে কার্যত ভূমিকাহীন হয়ে পড়েছে আওয়ামী লীগ। এটা দলের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

৩. তৃণমূলের দূর্নীতি এবং দুর্বল তৃণমূল

কিছুদিন ধরেই আওয়ামী লীগের তৃণমূল যে নষ্ট হয়ে গেছে সে কথা বলা হচ্ছে। এই করোনা সঙ্কটে তৃণমূলের দূর্নীতি নিয়ে নানারকম কথাবার্তা হচ্ছে। এর ফলে আওয়ামী লীগের যে মূল শক্তির ভিত্তি, সেই তৃণমূলই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এটা আওয়ামী লীগের জন্য একটি বড় সঙ্কট বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ তৃণমূলই যদি আওয়ামী লীগের না থাকে,

তাহলে আওয়ামী লীগের শক্তি খর্ব হতে বাধ্য বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিছুদিন ধরেই বলা হচ্ছিল যে, হাইব্রিড নেতারা এবং অনুপ্রবেশকারীরা আওয়ামী লীগ দখল করে নিয়েছে এবং এর একটা চিত্র পাওয়া গেল করোনা সঙ্কটে। স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, তাঁদের দূর্নীতি এবং অনিয়মের একাধিক ঘটনা শুধু আওয়ামী লীগের ইমেজ নষ্ট করে দেয়নি, সাথে সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগকে দূর্বল করে দিয়েছে।

৪. শরীকদের মাঝে চাপা অসন্তোষ

আওয়ামী লীগ যখন ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে মন্ত্রিসভা গঠন করলো, তখন তা থেকে শরীকদের বাদ দিয়ে শুধু আওয়ামী লীগের নেতাদের স্থান দেয়া হলো। তখন থেকেই আওয়ামী লীগের সাথে শরীকদের একটা টানাপড়েন চলছিল। আওয়ামী লীগের একলা চলো নীতি শরীকরা পছন্দ করেনি। কিন্তু এখন সঙ্কটের সময়েও আওয়ামী লীগ শরীকদেরকে সাথে নিচ্ছেনা এবং শরীকদের চাপা অসন্তোষ ক্রমশ প্রকাশ হতে শুরু করেছে। কোন কোন শরীকরা প্রকাশ্যেই সরকারের সমালোচনা করছে। এর ফলে আওয়ামী লীগ একলা হয়ে যাচ্ছে এবং একঘরে হয়ে গেলে যে আওয়ামী লীগ দূর্বল হয়ে যায়, অতীতে বারবার তাঁর প্রমাণ পাওয়া গেছে।

৫. বিএনপি চোখ রাঙাচ্ছে

খালেদা জিয়ার মুক্তি বিএনপিকে উজ্জীবিত করেছে এবং এখন করোনা সঙ্কটের সময় বিএনপি আবার নিজেদেরকে সংগঠিত করতে চাইছে। নেতাকর্মীরা যেন প্রাণ ফিরে পেরেছে এবং এইসময় বিএনপি একটি নতুন আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরি করছে। বিএনপির এই চোখ রাঙ্গানীও আওয়ামী লীগের জন্য একটি সঙ্কট বলে মনে করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগকে সামনের দিনগুলোতে যেমন অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলা করতে হবে, জনস্বাস্থ্য সঙ্কট মোকাবেলা করতে হবে, তেমনি দলের সঙ্কটও আওয়ামী লীগকে মোকাবেলা করতে হবে। কারণ রাজনৈতিক দলই যদি না থাকে, তাহলে ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগের লাভ কি?