নিয়ন্ত্রণের বাইরেই চলে যাচ্ছে বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি

নিয়ন্ত্রণের বাইরেই চলে যাচ্ছে বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি

বাংলাদেশে প্রতিদিন করোনার সংক্রমণ বাড়ছে। আজ তা ম্যাজিক নাম্বার স্পর্শ করেছে। ১ হাজার ৩৪ জন একদিনে আক্রান্ত হয়েছে। এই আক্রান্তের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ করোনার অন্ধকার টানেলে প্রবেশ করলো বলেই মনে করছেন চিকিৎসক এবং বিশেষজ্ঞরা। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন যে, করোনা এখনও সর্বোচ্চ সীমায় আসেনি, তবে সর্বোচ্চ সীমার দিকে যাচ্ছে।

আর এই সময় সবকিছু বন্ধ করা উচিত ছিল। কঠোরভাবে লকডাউন করা উচিত ছিল, যেন সামাজিক সংক্রমণ বন্ধ হয়। অথচ এই সময়ে আমরা মোটামুটি বাংলাদেশকে সচল করে ফেলেছি। যে কারণে করোনার বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, বাংলাদেশে এই সময়ে যদি লকডাউন থাকতো বা সামাজিক দূরত্ব বজায় থাকতো, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা থাকতো, তাহলে হয়তো করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যেত এবং আস্তে আস্তে চূড়ান্ত মাত্রা স্পর্শ করে বাংলাদেশে এটি নামতো। কিন্তু বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। তার কারণগুলো হচ্ছে-

১. দ্বিতীয় স্তরে সামাজিক সংক্রমণ শুরু হচ্ছে

যখন সামাজিক সংক্রমণ শুরু হলো, তখন সরকার সঠিকভাবেই সাধারণ ছুটির নামে লকডাউন আরোপ করেছিল। যখন করোনা সামাজিক সংক্রমণ ছড়াতে ছড়াতে সর্বোচ্চ সীমার কাছাকাছি এসেছে, তখন লকডাউন শিথিল করা হয়েছে। ঢাকা শহরে এখন মোটামুটিভাবে স্বাভাবিক দিনের মতোই অবস্থা। শুধুমাত্র গণপরিবহন ছাড়া ঢাকা শহরে সব যান চলাচল একেবারেই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে।

স্কুল কলেজ ছাড়া সব প্রতিষ্ঠানই মোটামুটি খুলে গেছে। মানুষ বাজার হাটে যাচ্ছে। দোকান পাট খুলে দেওয়া হয়েছে। হোটেল রেস্টুরেন্টও খুলে গেছে। ফলে এই পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় ধাপের সামাজিক সংক্রমণের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এই দ্বিতীয় ধাপের সংক্রমণটি মারাত্মক এবং ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। এর ফলে একেবারে গভীর সামাজিক সংক্রমণ হবে বাংলাদেশে। এরকম সংক্রমণ হলে পর্যায়ক্রমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

২. শতকরা হার

আমরা যদি শতকরা হিসেব দেখি তাহলে বাংলাদেশে প্রতি একশ জনে ১২ জন করোনায় সংক্রমিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘন্টায় যেটা হয়েছে, ১০০ জনে প্রায় ১৪ জনের বেশি মানুষ সংক্রমিত হয়েছে। অর্থাৎ নতুন যে পরীক্ষাগুলো হচ্ছে, তাতে যারা সংক্রমিত হচ্ছে, তার শতকরা হার গড় হারের চেয়ে বেশি। এটিই সামাজিক সংক্রমণ যে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ছে, তার বড় প্রমাণ। এই কারণেই বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে অনেকে ধারণা করছেন।

৩. মৃত্যু বাড়বে

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত করোনায় মৃত্যুর হার কম। এখন পর্যন্ত মোট মারা গেছে ২৩৯ জন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি সামাজিক সংক্রমণ ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে, তাহলে যারা অসুস্থ এবং যারা করোনার জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত যেমন- কিডনি রোগী, হৃদরোগ রোগী, উচ্চ রক্তচাপের রোগী, বয়স্ক মানুষসহ বিভিন্ন অসুখে থাকা মানুষজন আক্রান্ত হবেন।

তাদেরকে আর দূরে সরিয়ে রাখা যাবে না। যখন তারা আক্রান্ত হবেন, তখন তাদের মৃত্যুও ঠেকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ একে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এবং তারা আক্রান্ত হলেই দ্রুত খারাপ অবস্থার দিকে চলে যাবেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করছে, করোনায় যারা আক্রান্ত হয় তাদের ২০ ভাগ মোটামুটি জটিল অবস্থায় যায় এবং ৫ ভাগ জটিলতম পর্যায়ে যায়, যেখান থেকে তাদেরকে ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে যায়।

চিকিৎসকরা মনে করছেন, বাংলাদেশে যত সংক্রমণ বাড়বে তত এই ঝুঁকিপূর্ণ যে গ্রুপটি আছে বয়স্ক এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত তারা করোনার টার্গেট হবেন। তারা যখন আক্রান্ত হবেন তখন মৃত্যুর সংখ্যাও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

আর এ কারণেই মনে করা হচ্ছে যে, বাংলাদেশে সব কিছু শিথিল করে দেওয়া বিশেষ করে গার্মেন্টস, বাজার হাট সবকিছু খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে সামাজিক সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো কোনো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এখন আমাদের হাতে নেই। আমরা যদিও বলছি যে, হাত ধোয়া বা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা সামাজিক দূরত্ব মানার কথা।

কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবকিছু খুলে রেখে এ ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মানা প্রায় অসম্ভব। পৃথিবীর কোনো দেশ এটা পারেনি। আর সে কারণে অনেকেই মনে করছেন যে, বাংলাদেশ হয়তো তার সুযোগটি হারালো এবং একটি ভয়ঙ্কর অন্ধকার সময়ের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ এসে দাঁড়ালো।