তাহলে এই কারণেই সব কিছু খুলে দিচ্ছে সরকার ?

তাহলে এই কারণেই সব কিছু খুলে দিচ্ছে সরকার ?

করোনা মো’কাবেলায় স্পষ্টতই সরকার ভিন্ন কৌশলে যাচ্ছে। একদিকে জনস্বাস্থ্যগত বিষয়গুলো যেমন সরকার মোকাবেলা করার জন্য তৎপরতা দেখাচ্ছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেন স্থবির না হয়ে পড়ে সেজন্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতেও সরকার একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এটা নিয়ে সরকার সমালোচনার মুখে পড়েছে।

অনেকেই মনে করছে যে, যখন করোনার পিক সিজন শুরু হয়েছে, সর্বোচ্চ সীমায় যখন করোনা পৌঁছতে যাচ্ছে, তখন দোকান-পাট, গার্মেন্টস কলকারখানা, অফিস-আদালত খুলে দেওয়া আ’ত্মঘা’তী সিদ্ধান্ত। আবার অনেকেই বলছেন যে, এই সময়ে এসব খুলে দেওয়ার ফলে সামাজিক সংক্রমণের ভ’য়াবহ আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এর ফলে করোনার প্র’কোপ বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু সরকারের একাধিক নীতি নির্ধারকের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে যে সরকার খুব চিন্তা-ভাবনা করেই পদক্ষেপ নিচ্ছে। সরকার খুব হিসেব-নিকেষ করেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল রাখাটাকে প্রাধান্য দিচ্ছে।

করোনার যে স্বাস্থ্যগত ঝুঁ’কি সেটাকে দ্বিতীয় স্থানে রেখেছে সরকার। এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কারণ হলো বাংলাদেশে করোনায় মৃত্যুর হার এখন পর্যন্ত কম। সারা বিশ্বে করোনায় এখন পর্যন্ত মৃত্যুর হার হলো ৬.৯ ভাগ।

বিশ্বে আজ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৩৭ লাখ ৪১ হাজার ২৭৬ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ২ লাখ ৫৮ হাজার ৫১১ জন। আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও করোনার কারণে মৃত্যুর হার ৫.৮৩ ভাগ। সে তুলনায় বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত করোনায় মৃত্যুর হার ১.৫৮ ভাগ।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত করোনায় মোট আক্রান্ত হয়েছেন ১১ হাজার ৭১৯ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ১৮৬ জন। এই মৃত্যুর হারটি বাংলাদেশে সরকারের নীতি নির্ধারকদেরকে উৎসাহিত করেছে এবং আশাবাদী করে ফেলেছে। এর ফলে বাংলাদেশে নীতি নির্ধারকদের একাংশের মধ্যে এরকম একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, করোনা শুধুই একটি রোগ।

এই রোগটাকে নিয়েই আমাদের বসবাস করতে হবে। একটি রোগ তখনই ভয়াল হয়ে ওঠে, যখন সেই রোগে মৃত্যুর হার বেশি থাকে। বাংলাদেশে হৃ’দরোগ আছে, ডায়াবেটিস আছে, কিডনি রোগ আছে, ক্যানসার আছে। কাজেই করোনাকে নতুন একটি রোগ হিসেবে আমাদের প্রতিদিনকার জীবনে বসবাস করবে, এটাই বাস্তবতা। এরকম একটি বোধ থেকেই সরকার অর্থনীতির দিকেই নজর বেশি দিতে চাইছে।

প্রতিবছর বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে অনেক মানুষ মারা যায়। জ্বর, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি অসুখ বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত লেগেই থাকে। বাংলাদেশে ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব সারা বছরজুড়েই থাকে। কাজেই এ রকম অনেক রোগের মধ্যে করোনাও একটি রোগ। করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে যদি আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে চলি, তাহলে এই রোগটি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে না।

গত প্রায় দুই মাসের হিসেব নিকেশগুলো সরকার পর্যালোচনা করে দেখেছে যে এই সময়ে বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের হার খুব বড় ধরনের উল্লম্ফন দেয় নি। খুব হঠাৎ করে মাত্রাতিরিক্ত হয়ে বেড়েও যায় নি, যেটা ইতালি স্পেনে হয়েছিল।

বাংলাদেশের করোনা সংক্রমণের হার গত এক সপ্তাহে বাড়ছে বটে, তবে তা স্থিতিশীলভাবে বাড়ছে। একই হারে বাড়ছে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত যত পরীক্ষা করা হয়েছে, তাতে ১১.৮৪ শতাংশ হারে রোগী শনাক্ত হচ্ছে। প্রায় এক লাখের কাছাকাছি করোনা রোগী পরীক্ষা হয়েছে। এই এক লাখের কাছাকাছি পরীক্ষায় ১৮৬ জনের মৃত্যুটা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত আশাজাগানিয়া বলে মনে করছে সরকার।

তবে সরকারের এই পরিকল্পনা এবং এই বিশ্লেষণের সঙ্গে অনেক বিশেষজ্ঞই একমত নন। তারা মনে করেন যে, মৃত্যুর হার এখন কম এজন্য আত্মতুষ্টির কোনো কারণ নেই। কারণ মৃত্যুর হার বাংলাদেশে এখন কম, মৃদু উপসর্গের রোগীর সংখ্যা বেশি। মৃদু উপসর্গসহ রোগীরা নিজেরা চেষ্টা করলেই সুস্থ হয়ে ওঠেন।

কিন্তু যদি করোনা রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং যদি সামাজিক সংক্রমণকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, তাহলে মৃত্যুর হার চোখের পলকেই অনেক বেড়ে যেতে পারে। এর বড় উদাহরণ হলো ইতালি এবং স্পেন। এজন্য এখন থেকেই সরকারকে সচেতন হওয়ার জন্য পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

সরকার করোনা মোকাবেলা করার জন্য যেমন কাজ করছে, পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংকটে যেন দেশ অচল না হয়ে পড়ে, সেটাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। এই গুরুত্ব দেওয়াটা সরকারের সঠিক সিদ্ধান্ত নাকি ভুল সিদ্ধান্ত সেটি বোঝা যাবে আর কিছু দিনের মধ্যেই।