চরম দুর্দিনে শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের হাজার কোটি টাকা কোথায়?

চরম দুর্দিনে শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের হাজার কোটি টাকা কোথায়?

করোনা পরিস্থিতির কারণে বদলে গেছে পরিবহণ শ্রমিকদের জীবন। বন্ধ গণপরিবহন, কাজ নেই তাই অভাব অনটনে দিন কাটাচ্ছে বেশিরভাগ পরিবহন শ্রমিকরা। শ্রমিকদের অনেকের অভিযোগ শ্রমিকদের কল্যাণ তহবিলের নামে পরিবহন মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলো প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা জমা করে কিন্তু শ্রমিকরা বিপদে কোন সহয়তা পায়না। এ কল্যাণ কাদের জন্য। এ টাকা কোথায়? এমন প্রশ্ন বেশিরভাগ শ্রমিকের।

জানা গেছে, এই টাকার কোনো হিসাব নেই। বেপরোয়া চাঁদাবাজিতে জর্জরিত পরিবহন খাতের মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। তারা পরিবহন খাতের চাঁদাবাজিতে মিলেমিশে একাকার। ফলে শ্রমিকদের ভয়াবহ দুর্দিনেও পাশে নেই শাজাহান খান, মসিউর রহমান রাঙ্গা, শিমুল বিশ্বাস, ওসমান আলীর মতো পরিবহন খাতের নেতারা। জানা গেছে, সব মিলিয়ে সারা দেশের ৮ লাখের বেশি বাণিজ্যিক যানবাহন থেকে দৈনিক ৭০ টাকা হারে চাঁদা আদায় হয় মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নামে। এ হিসাবে বছরে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায় হয়। এর বাইরে অঘোষিত বেনামিও অনেক চাঁদা আদায় হয়। এই রহস্যময় চাঁদার হিসাবও অজানা।

ফলে করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে বেকার হয়ে যাওয়া শ্রমিকদের এখন ত্রাহি অবস্থা। শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের নামে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা চাঁদা আদায় হলেও করোনাভাইরাসের এই চরম দুর্দিনে শ্রমিকদের পাশে নেই নেতা নামধারীরা। জানা গেছে, যে ৭০ টাকা চাঁদা আদায় হয়, তা ভাগাভাগি করে নেন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।

এর মধ্যে ৪০ টাকা নেয় মালিক সমিতি আর ৩০ টাকা নেয় শ্রমিক ইউনিয়ন। মালিক সমিতিগুলো বহু ভাগে বিভক্ত হলেও মূল সংগঠনের কান্ডারি জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা, আওয়ামী লীগের নেতা ও ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর পরিচালক খোন্দকার এনায়েত উল্যাহ।

আর শ্রমিক সংগঠনগুলোর একক কর্তৃত্বে রয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান। তার সঙ্গী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাস বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক। ওই চাঁদার বাইরেও ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে গেটপাস (জিপি) নামে বিপুল অঙ্কের চাঁদা তোলা হয়। এ ছাড়া দূরপাল্লার সড়কপথে কেউ বাস নামাতে চাইলে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করে বিভিন্ন জেলা মালিক-শ্রমিক সমিতি।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী অভিযোগ করে বলেন, কল্যাণ তহবিলের নামে চাঁদা তুলে সেই টাকা আত্মসাৎ করেছেন মালিক ও শ্রমিক নেতারা। এই অপকর্ম করেও শ্রমিকদের দুরবস্থায় পাশে নেই কেউ। এর পরও কিন্তু শ্রমিকরা গাড়ি পাহারা দিচ্ছেন। অথচ নেতারা পরিবহন খাতে ভয়াবহ লুটপাট করেছেন। এখন শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

অনেক পরিবহন মালিকের হাজারো গাড়ি আছে। তারা অঢেল সম্পদের মালিক হলেও শ্রমিকদের জন্য কিছুই করছেন না। তারা সব সরকারের আমলেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আবদুল ওয়াদুদ নয়ন অভিযোগ তুলে বলেন, ‘শ্রমিকরা এখন সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় আছেন। এক জায়গার শ্রমিক এখন আরেক জায়গায় গাড়ি নিয়ে গিয়ে আটকা পড়েছেন। তাদের কেউ ত্রাণও দেয় না।

এখন পর্যন্ত শ্রমিকদের সরকার সরাসরি কোনো ত্রাণ দেয়নি। দু-এক জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে আমাদের অনুরোধে দেওয়া হয়েছে। আর মালিক সমিতি ৭০ টাকা করে কল্যাণ তহবিলের নামে যে চাঁদা আদায় করত, তাও নিজেরাই লুটপাট করেছে।’ বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের (টিইউসি) সাধারণ সম্পাদক ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান বলেন, ‘পরিবহনসহ সব খাতের শ্রমিকদের অবস্থা খুবই দুঃখজনক।

আগে রাস্তায় ভিক্ষুক ছিল না, কিন্তু করোনাভাইরাসের এই চরম দুর্দিনে বাড়ি বাড়ির সামনে ভিক্ষুকের আহাজারি। শ্রমিকরা এখন খুবই অসহায়। তাদের জন্য শ্রম মন্ত্রণালয়ের শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের তহবিল থেকে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করেছি।’ তবে শ্রম মন্ত্রণালয়ের শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের তহবিলও করোনাভাইরাসের সংক্রমণে চরম অভাব-অনটনে থাকা পরিবহন শ্রমিকদের কাজে আসছে না।

আইন অনুযায়ী, সারা দেশে সক্রিয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন কর্মকান্ডের মাধ্যমে অর্জিত মুনাফার ৫ শতাংশ শ্রমিক কল্যাণে খরচ করতে হবে। আর লভ্যাংশের একটি নির্দিষ্ট অংশ সরকারের বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের তহবিলে জমা দিতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় তহবিলে এখন ৪০০ কোটি টাকার বেশি জমা রয়েছে। আইনি বিধিবিধান না থাকায় করোনাভাইরাসের সময় শ্রমিকদের কল্যাণে ওই অর্থ খরচের সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে শ্রম মন্ত্রণালয়।

এ প্রসঙ্গে শ্রম মন্ত্রণালয়ের শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব ড. মো. রেজাউল করিম বলেন, করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে শ্রমিক কল্যাণ তহবিল থেকে অনুদান দেওয়ার আইনি বিধিবিধান নেই। এই তহবিল থেকে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি দিক বিবেচনা করে শ্রমিকদের অর্থ প্রদান করা হয়। তবে চিকিৎসার জন্য কোনো শ্রমিক আবেদন করলে টাকা দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত যানবাহন আছে প্রায় ৪৪ লাখ। এসব পরিবহনের সঙ্গে প্রায় ৭০ লাখ শ্রমিক যুক্ত আছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ২৬ মার্চ থেকে সারা দেশে পরিবহন চলাচল বন্ধ। তবে কিছু পরিবহন চলাচল করছে।

এর মধ্যে রয়েছে পণ্যবাহী যান, অল্পসংখ্যক ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল। পরিবহন মালিক সমিতিগুলো বলছে, নজিরবিহীন এই পরিবহন সংকটে দৈনিক ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। সড়ক পরিবহন আইন অনুসারে, পরিবহন শ্রমিকদের নিয়োগপত্র দেওয়া বাধ্যতামূলক। আর তাদের বেতনও হওয়ার কথা মাসিক। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বাস-ট্রাকের চালকদের প্রায় সবাই দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে চলেন। অল্প কিছু বড় কোম্পানি বাসচালকদের মাসিক বেতন দেয়। তবে তাদের মূল আয় হয় ট্রিপের (যাত্রা) ওপর। অন্য বাণিজ্যিক যানের শ্রমিকদেরও একই চিত্র।

জানা গেছে, দেশে পণ্য পরিবহনের যানবাহন আছে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ। এর মধ্যে আছে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, ট্রেইলর, পিকআপ ভ্যান। আবার রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে যাত্রী পরিবহনের বাস-মিনিবাস আছে ৮০ হাজারের বেশি। পণ্যবাহী পরিবহনগুলোতে চালকসহ কমপক্ষে দুজন করে কর্মী থাকেন। আর যাত্রীবাহী যানে চালক, সহকারী ও ভাড়া আদায়ের জন্য তিনজন করে কর্মী কাজ করেন।

এর বাইরে টিকিট বিক্রির কাউন্টারগুলোর কর্মী আছেন। দেশে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মাইক্রোবাস আছে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ। এর একটা অংশ সরকারি বিভিন্ন কার্যালয়ের। বাকিগুলো ব্যক্তিগত কাজের। কিছু আছে ভাড়ায় চালিত। ব্যক্তিগত গাড়ির চালকদের অনেকেই ছুটি দিয়েছেন। তারা চলতি মাসের বেতন পাবেন কিনা, সেটিও বড় উদ্বেগের বিষয়। অনেক ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকরা চালক ছাঁটাই করছেন।

সূত্রঃ ভোরের পাতা