গবেষণায় আশার আলো দেখছেন বিজ্ঞানীরা

করোনাভাইরাসের চিকিৎসা পদ্ধতি ও ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিজ্ঞানীদের জোর চেষ্টা চলছেই। এখনো পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ সফলতা না এলেও আশার আলো দেখছেন বিজ্ঞানীরা। গুরুতর রোগীদের ক্ষেত্রে ব্লাড থিনার বা রক্ত পাতলাকারী ওষুধের আশানুরূপ ফল পাওয়া গেছে।

যাদের মৃদু থেকে মাঝারি উপসর্গ আছে তাদের ক্ষেত্রে তিনটি অ্যান্টিভাইরাল ওষুধের সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির ইনজেকশনের সমন্বিত চিকিৎসায় দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে দেখা গেছে। নতুন উদ্ভাবিত একটি ভ্যাকসিন বা টিকা বানরের ওপর প্রয়োগ করে সফলতা পাওয়ার দাবি করেছেন চীনা বিজ্ঞানীরা।

যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী জার্নাল অব দ্য আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজিতে গত বুধবার প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, করোনা মহামারীর বিস্তারের শুরু থেকেই চিকিৎসকেরা বলছেন, কোনো কোনো করোনা সংক্রমিত রোগীর রক্ত জমাট বাঁধার মতো সমস্যা দেখা যাচ্ছে। তবে এসব জমাট রক্ত পুরোপুরি কঠিন নয়, জেলের মতো নরম।

করোনায় মৃত্যু হওয়া কিছু রোগীর ময়নাতদন্তে দেখা গেছে, তাঁদের ফুসফুসে সংক্রমণের কারণে যে ধরনের ক্ষতি হওয়ার কথা ছিল, তা পাওয়া যায়নি। তাঁদের ফুসফুসে বরং খুব ছোট আকৃতির জমাট বস্তু পাওয়া গেছে। নিউইয়র্কের হাসপাতাল ব্যবস্থায় করোনা সংক্রমিত ২ হাজার ৭৩৩ জন রোগীর ওপর পর্যবেক্ষণ করে গবেষণায় পাওয়া গেছে, শিরা ও ধমনির মধ্যে রক্তের প্রবাহ বাধাহীন করতে ব্যবহার করা ব্লাড থিনার বা রক্ত পাতলাকারী ওষুধ রক্ত জমাট বাঁধতেও বাধা দেয়।

করোনাভাইরাসে সংক্রমিত গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ক্ষেত্রে জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করে আশানুরূপ ফল পাওয়া গেছে। অবশ্য গবেষক দলের সদস্য নিউইয়র্কের মাউন্ট সিনাই হাসপাতালের চিকিৎসক ভেলেন্টিন ফাস্টারের মতে, তাঁরা যে তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেছেন, তা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসার জন্য যথেষ্ট নয়। এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

তবে তাঁরা যে ফল পেয়েছেন, তা আশানুরূপ। সায়েন্স ম্যাগাজিনকে উদ্ধৃত করে ভারতের অনলাইন ডিএনএর খবরে বলা হয়, চীনা বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, নতুন উদ্ভাবিত একটি ভ্যাকসিন বা টিকা বানরের ওপর প্রয়োগ করে সফলতা পাওয়ার। তারা বলছেন, পিকোভ্যাক নামের এই ভ্যাকসিনটি বানরের ওপর প্রয়োগ করে তারা যথেষ্ট সফলতা পেয়েছেন।

এই ভ্যাকসিনের উদ্ভাবক বেইজিংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সিনোভ্যাক বায়োটেক। এর গবেষকরা মার্চের শুরুতে রিসার্চ ম্যাকাকিউস প্রজাতির একদল বানরের ওপর এই ভ্যাকসিনটি প্রয়োগ করেন। এরপর তিন সপ্তাহ পরে এই বানরগুলোকে করোনাভাইরাসের সংস্পর্শে নেওয়া হয়। সপ্তাহখানেক পরে দেখা যায়, এ বানরগুলো সংক্রমিত হয়নি। অর্থাৎ এদের শরীরে এন্টিবডি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে যে বানরের শরীরে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়নি তাদের ফুসফুসে করোনা সংক্রমণ পাওয়া গেছে। এমনকি কয়েকটির শরীরে নিউমোনিয়া সংক্রমণের লক্ষণও দেখা দিয়েছে। এর পরই তারা এপ্রিলের মাঝামাঝি মানবদেহেও এই ভ্যাকসিনের পরীক্ষা শুরু করেছেন।

ল্যানসেট মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত এক নিবন্ধে জানানো হয়, হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. কিয়ক-ইয়ুং উয়েন ও তার সহকর্মীরা নতুন করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের এইচআইভি চিকিৎসায় ব্যবহৃত রিটোনেভির ও আইওপেনেভিরের সঙ্গে সাধারণ অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ রিবাভিরিন এবং বেটা ইন্টারফেরন নামে পরিচিত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাবর্ধক ওষুধ ব্যবহার করেছেন। এ পদ্ধতিতে মৃদু ও মাঝারি উপসর্গের রোগীরা নতুন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সাত দিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন তারা।

‘ট্রিপল ড্রাগ থেরাপি’ নিয়ে গবেষণায় উয়েন ও তার সহকর্মীরা রোগীদের দুটি ভাগ বিভক্ত করেছিলেন। এদের মধ্যে এক ভাগকে দেওয়া হয়েছিল এইচআইভি চিকিৎসায় ব্যবহৃত আইওপিনেভির ও রিটোনেভির। আরেকভাগকে এ দুই ওষুধের সঙ্গে আরও দেওয়া হয় অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ রিবাভিরিন ও বেটা ইন্টারফেরনের ইনজেকশন। দেখা গেছে, তিনটি ওষুধ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাবর্ধক নেওয়া রোগীরা গড়ে সাত দিনেই সুস্থ হয়ে গেছেন।

অন্যদিকে কেবল আইওপিনাভির ও রিটোনেভির নেওয়া রোগীদের শরীরে ১২ দিন পরও ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। চিকিৎসকরা বলছেন, ‘ট্রিপল ড্রাগ থেরাপি’ নেওয়া রোগীরা মাত্র চার দিনের মধ্যেই ‘ভালো বোধ করা শুরু করেন’। প্রাথমিক পরীক্ষায় এ ট্রিপল অ্যান্টিভাইরাল থেরাপিকে নিরাপদ মনে করা হচ্ছে। এটি আইওপিনেভির ও রিটোনেভিরের তুলনায় মৃদু ও মাঝারি কভিড-১৯ রোগীদের উপসর্গ দ্রুত দূর ও ভাইরাসের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে।

তিন ওষুধের সমন্বিত প্রয়োগে রোগী দ্রুত সুস্থ হলেও এর সামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও আছে। হংকংয়ের চিকিৎসকদের এ গবেষণা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় নতুন আশা দেখাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. পিটার চিন-হং। তিনি বলেন, এই গবেষণা সত্যিই সঞ্জীবনী। কেননা, এতদিন কেবল রেমডেসিভিরই ছিল। এখন সেখানে আরও বিকল্প যুক্ত হচ্ছে।