করোনা মোকাবেলায় উল্টো পথে হাঁটছে সরকার!

করো’না মোকাবেলার ৬০ তম দিন হতে যাচ্ছে আগামীকাল। ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করো’না রোগী শনা’ক্ত হয়েছিল আর এরপর দুই মাস সময় অতিবাহিত হয়েছে। এই দুই মাসে সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। কিছু পদক্ষেপ ইতিবাচক প্রশংসিত হয়েছে জাতীয়-আন্তর্জাতিকভাবে, আবার কিছু পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে।

করো’নার দুই মাসের প্রাক্বালে প্রশ্ন উঠেছে যে, করো’না মোকাবেলায় সরকার কি সঠিক পথে এগোচ্ছে? নাকি উল্টো পথে হাঁটছে। করো’না মোকাবেলায় বাংলাদেশ যেসব পদক্ষেপ শুরু থেকে নিয়েছিল, সেসব পদক্ষেপ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বাংলাদেশ অনেক ইতিবাচক কাজ করেছে।

আবার যখন বাংলাদেশে করো’নার পিক বা সর্বোচ্চ সীমা অতি’ক্রম করছে, তখন দোকানপাট, গার্মেন্টস এবং সবশেষ মসজিদ খুলে দেওয়ার ফলে একটা নেতিবাচক ধারণাও সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক চিকিৎসক-বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, এভাবে সবকিছু খুলে দেয়ার ফলে করো’না সং’ক্রম’ণের ঝুঁ’কি বাড়লো। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবিএম আবদুল্লাহ পর্যন্ত মনে করছেন যে, এই কাজটি ঠিক হয়নি।

তাহলে সরকার কেন এটা করলো এবং সরকার করো’না মোকাবেলায় সঠিক পথে আছে কিনা এই প্রশ্নটি উঠেছে। এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, যদি সরকার করো’না মোকাবেলায় ভ্রান্ত পথে হাঁটে, তাহলে করো’না সং’ক্রম’ণের শেষ কিনারায় পৌঁছে যাব আমরা।

শুধু জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি হবেনা, বাংলাদেশ এক কঠিন সঙ্কটের মধ্যে পড়বে, আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদী সমস্যায় জর্জরিত দেশ হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে আবার ঠাঁই পাবে। কাজেই করোনা মোকাবেলায় সঠিক এবং সুচিন্তিত পদক্ষেপ গ্রহণ করাটাই অত্যন্ত জরুরী।

বাংলাদেশে যখন প্রথম করো’না শনা’ক্তের ঘোষণা দেয়া হয়, সেসময় বাংলাদেশে ছিল একটি উৎসবমুখর পরিবেশ। কারণ কদিন পরেই মুজিববর্ষের অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা ছিল। এই মুজিববর্ষের অনুষ্ঠান বাদ দেয়াটা একটি কঠিন সিদ্ধান্তই ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঐ কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণে এক মুহুর্ত দেরি করেননি। করো’না মোকাবেলায় সরকারের এই সিদ্ধান্তটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সঠিক সিদ্ধান্ত।

এর সঙ্গে সঙ্গেই সরকার সকল ধরণের সভা-সমাবেশ, গণজমায়েতের মতো কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়, এটাও ছিল ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং একই সঙ্গে সরকার বিদেশ ফেরত বাংলাদেশিদের বাধ্যতামূলক হোম কোয়ারেন্টাইন পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যদি সেটা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কিছু সমস্যায় পড়তে হয়েছে। এরপর সরকার করো’না মোকাবেলার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে এবং এটা বিপুলভাবে সমাদৃত হয়।

২৬শে মার্চ থেকে সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে এবং সেখানে গণপরিবহনসহ সামাজিক মেলামেশা হতে পারে এমন সবকিছু বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এই পর্যন্ত সরকারের সকল পদক্ষেপ ইতিবাচকই ছিল এবং করো’না সং’ক্রম’ণের যে ব্যাপক সং’ক্রম’ণের শ’ঙ্কা করা হয়েছিল সেই পরিমাণ সং’ক্রম’ণ হয়নি।

আবার উল্টো দিকে যদি আমরা বিবেচনা করি তাহলে শুরু থেকে সরকার কিছু ভুল পদক্ষেপও নিয়েছে। উহান ফেরত বাংলাদেশিদের যেভাবে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা উচিত ছিল তা রাখা হয়নি, একইভাবে ইতালি ফেরতদেরকে আমরা হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখতে পারিনি, যেখান থেকেই করো’না সং’ক্রম’ণের সূত্রপাত বলে ধারণা করা হয়।

এরপর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যে প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত ছিল, সেই প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারেনি, বরং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নানারকম জগাখিচুড়ী বানিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার চেষ্টা করেছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুল এবং ভ্রান্তভাবে এগিয়েছে করো’না মোকাবেলার ক্ষেত্রে।

তাঁরা বিশেষায়িত হাসপাতালের কথা বলেছিল, সেই বিশেষায়িত হাসপাতালগুলো প্রস্তুত ছিল না। তাঁরা সীমিত আকারে আইইডিসিআর-এর মাধ্যমে করো’না পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছিলে এবং পরবর্তীতে এই পরিধি বাড়াতে গিয়ে দেখা গেল যে, তাঁদের লোকবলের অভাব রয়েছে।

এরকম নানা সমস্যা এবং অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিয়েছিল এবং যে কারণে করোনা মোকাবেলার প্রথম দিকে প্রধানমন্ত্রী সমস্ত দায়-দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে নিজস্ব উদ্যোগে করোনা মোকাবেলার প্রস্তুতি গ্রহন করেছিলেন। তবে সবথেকে বড় যে প্রশ্ন উঠেছে যে, শেষ মুহুর্তে এসে যখন করো’নার পিক সিজন শুরু হলো, তখন গার্মেন্টসগুলো খুলে দেয়া, রপ্তানিমূখী কারখানা খুলে দেয়া এবং কিছু অফিস, দোকান, শপিং মল খুলে দেয়া সহ কিছু উন্মুক্তকরণ কর্মসূচী জনগণের মধ্যে বিরূপ প্রতি’ক্রিয়া তৈরি করেছে।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে মনে হচ্ছে যে, এই পদক্ষেপগুলো ভুল নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী এই পদক্ষেপগুলো ইতিবাচক বিবেচিত হবে। করোনার সাথে যুদ্ধ এবং অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার একসঙ্গে পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার এবং এটাকে বলা হচ্ছে বাংলাদেশের মডেল। আর এই পদক্ষেপটি যদি শেষ পর্যন্ত সফল হয়, তাহলে করো’না মোকাবেলায় বিশ্বে নতুন একটি মাইলফলক হবে। আর ব্যর্থ হলে বাংলাদেশকে করো’নাকে উপেক্ষা করার বড় মূল্য দিতে হবে।