করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখাতেই কম পরীক্ষা ?

করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখাতেই কম পরীক্ষা ?

করোনার লাগাম টেনে ধরার জন্য বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এক অদ্ভূত কৌশল নিয়েছে। এই কৌশলটা হলো উট পাখির নীতির মতো। যত কম আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দেখানো যাবে ততই করোনার পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখানো যাবে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখালে সরকারের উপর মহল খুশি থাকবে। সবকিছু ঠিকঠাকমতো চলবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই স্বাভাবিক দেখানোর কারণেই পোষাক শিল্প কারখানা, কলখারখানাগুলো খুলে গেছে। ঈদ উপলক্ষে শপিং মল মার্কেট খোলারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখাতে পরীক্ষার ওপর নিয়ন্ত্রণ করছে। সীমিত আকারের পরীক্ষাই বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখানোর মূল চাবিকাঠি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত পরীক্ষার সংখ্যা ৬ হাজার অতিক্রম করেছে মাত্র দুইদিন। ৫ হাজার ২০০ থেকে ৮০০ এর মধ্যে পরীক্ষা ঘোরাফেরা করছে। যখনই দেখা যাচ্ছে করোনা সংক্রমণের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে, তখনই পরীক্ষার ওপর খড়গ চলে আসছে। পরীক্ষা সংখ্যা কমিয়ে রোগীর সংখ্যা কম দেখানোর এক অদ্ভূত ব্যাপার লক্ষ্য করা যায়। গত কয়েকদিন ধরে যখন সাতশোর ওপর ক্রমশ করোনা সংক্রমণের হার হচ্ছিল ঠিক সেই সময় পরীক্ষার হার কমিয়ে দেওয়া হলো।

গত ২৪ ঘন্টায় মোট পরীক্ষা করা হয়েছে ৫ হাজার ৪৬৫ জন। অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রেস ব্রিফ্রিংয়ে বলা হলো, ৩৫ টি ল্যাব থেকে এই পরক্ষা করা হয়েছে। পরীক্ষার হার বাড়ানোর জন্যই ল্যাবের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে, তারা দিনে ১০ হাজার পরীক্ষা করাতে ইচ্ছুক।

কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যগুলোতে দেখা যাচ্ছে যে, প্রতিদিন পরীক্ষার হার ৬ হাজার অতিক্রম করছে না। যখনই পরীক্ষার হার সাড়ে ৫ হাজারের ওপরে যাচ্ছে তখনই আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হয়ে যাচ্ছে। এ কারণেই পরীক্ষার হার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে কিনা সেটি একটি প্রশ্ন।

আমরা যদি দেখি, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের পরীক্ষার হার অনেক কম। এমনকি পাকিস্তানে যেখানে ২ লক্ষ ৭০ হাজার ২৫ জনের পরীক্ষা হয়েছে গতকাল পর্যন্ত। সেখানে বাংলাদেশের পরীক্ষা করা হয়েছে ১ লক্ষ ১৬ হাজার ৯১৯ জনের।

৮ মার্চ থেকে যদি আমাদের করোনার সংক্রমণের শুরুর সময় ধরা হয়। তাহলে ৬১ দিনে আমাদের গড় পরীক্ষা হয়েছে ২ হাজারেরও কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইইডিসিআর সীমিত আকারে পরীক্ষা শুরু করেছিল পয়লা মার্চ থেকেই। কাজেই সেই বিবেচনা করলে বাংলাদেশে প্রতিদিন আমরা গড়ে ২ হাজারও পরীক্ষা করতে পারিনি।

এই সীমিত সংখ্যক পরীক্ষার কারণে এক ধরণের আত্মতুষ্টি হয়তো সাময়িকভাবে নেওয়া যাবে। কিন্তু এর পরিণাম অত্যন্ত খারাপ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ সীমিত পরীক্ষার ফলে বহু মানুষ পরীক্ষার আওতার বাইরে থাকছে। তারা প্রতিদিন হাসপাতালগুলোতে পরীক্ষার জন্য দীর্ঘ লাইনে দাড়াচ্ছে। করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বয়ে বেড়াচ্ছেন।

দ্বিতীয়ত, হাসপাতালের বাইরেও তারা বিভিন্নভাবে চলাফেরা করছেন। তারা অন্যকে সংক্রমিত করছেন।

তৃতীয় শঙ্কা, সীমিত পরীক্ষার কারণে সামাজিক সংক্রমণের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটছে। দেখা যাচ্ছে যে, উপসর্গ ছাড়া বিপুল সংখ্যাক সংক্রমিতব্যক্তি সামাজিকভাবে অবাধে ঘোরাফিরা করছে। ভয়াবহ পরিস্থিতির দাড়প্রান্তে দেশকে নিয়ে যাচ্ছে। সেজন্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছিল যে, করোনা মোকাবিলার সবচেয়ে প্রকৃষ্ট উপায় হলো- টেস্ট টেস্ট টেস্ট। কিন্তু যখনই টেস্ট করতে গিয়ে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, তখনই আমরা পিছু হাটছি টেস্টে।

একাধিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু যে কম সংখ্যক পরীক্ষা হচ্ছে সেটাই না। যাদের পরীক্ষা করা হচ্ছে তাদের মধ্যে সাধারণ মানুষের সংখ্যা খুবই কম। এ পরীক্ষাগুলোর মধ্যে সরকারী কর্মকর্তা, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাসহ বিভিন্ন বিশেষ ব্যক্তিত্বদের বাদ দিয়ে স্বল্প সংখ্যক সাধারণ মানুষের পরীক্ষা হচ্ছে। যার ফলে করোনা উপসর্গ আছে বা করোনা সংক্রমণ আছে এরকম একটি বিপুল জনগোষ্ঠী পরীক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এরফলে বাংলাদেশ করোনা সঙ্কটের একটি অনিশ্চিত অতল গহ্বরে আমরা প্রবেশ করছি বলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।