করোনা: আশঙ্কার চেয়েও খারাপ হচ্ছে বাংলাদেশের অবস্থা

করোনা: আশঙ্কার চেয়েও খারাপ হচ্ছে বাংলাদেশের অবস্থা

করোনা নিয়ে বাংলাদেশে সবচেয়ে খারাপ যে প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল তা হলো, বাংলাদেশে এক লাখের মতো রোগী আক্রান্ত হতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এই প্রক্ষেপণ করেছিল। কিন্তু এখন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে করোনা পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে, তাতে দেশে করোনা সংক্রমণের সংখ্যা অনেক বাড়বে। সবচেয়ে খারাপ যেটা আশঙ্কা করা হয়েছিল, তার চেয়েও খারাপ পরিস্থিতি বাংলাদেশে হতে পারে।

বিশ্লেষকরা দেখিয়েছেন যে, গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা সংক্রমিত হয়। তখন পুরো মাসজুড়ে বাংলাদেশে করোনা সংক্রমিত রোগী ছিল মাত্র ৫১ জন। এপ্রিলে পুরো মাসজুড়ে করোনায় সংক্রমিত হয় ৭ হাজার ৬১৬ জন। আর এখন মে মাসে প্রতি দুই দিনে এক হাজারের বেশি মানুষ সংক্রমিত হচ্ছে। এই ধারা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে মে মাসের শেষে গিয়ে ১৫ হাজারের বেশি সংক্রমিত হবে।

তবে একজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন যে, এই সংখ্যা অনেক বাড়বে। কারণ আমাদের এখনও পিক সময়টি শুরু হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে যে বাংলাদেশ করোনা সংক্রমণের সর্বোচ্চ পরিস্থিতিতে পৌঁছাবে মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে (১৫ মে)।

তবে এর বিপরীতে কোনো বিশেষজ্ঞ বলছেন যে, বাংলাদেশে সর্বোচ্চ অবস্থা চলতেই থাকবে। কারণ আমরা সে সমস্ত ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং ভুল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি, তার জন্য বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদী করোনা পরিস্থিতি থাকতে পারে।

বাংলাদেশে এখন করোনার কতগুলো হটস্পট তৈরি হয়েছে, যেখানে একজন ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত হলে দ্রুত অনেক রোগীর সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে। যার ফলে বাংলাদেশে ঝুঁকি অনেক বেড়েছে। যত খারাপ আশঙ্কা করা হচ্ছিল বাস্তবে তার চেয়েও খারাপ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যাচ্ছে।

একজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন যে, বাংলাদেশে ইতিমধ্যে নীরব মহামারী শুরু হয়ে গেছে। আমরা পরীক্ষা সীমিত করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখানোর প্রাণান্ত চেষ্টা করছি। কিন্তু সেটাও সফল হচ্ছে না।

পরীক্ষা সীমিত রাখার একটি উদাহরণ দেওয়া যায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আজকের আগের ২৪ ঘন্টায় অর্থাৎ গতকাল পরীক্ষা করেছিল ৫ হাজার ৮২৭ জনের। গতকালের করোনা বুলেটিনে তারা বলেছিল, নতুন করে পরীক্ষার ল্যাব বাড়ানো হচ্ছে। বেসরকারি খাতেও ল্যাব তৈরি হচ্ছে এবং আরও বেশি করে তারা পরীক্ষা করবে। কিন্তু এটি বলার ২৪ ঘন্টার মধ্যেই আজ যে ব্রিফিং করা হলো, সেখানে ৫ হাজার ৩৬৮ জনের পরীক্ষা করা হয়েছে।

আরেকটি মজার ব্যাপার হলো, গতকাল ২৪ ঘন্টায় পরীক্ষা করে তারা পেয়েছিল ৫৫২ জন রোগী। সেটা নিয়ে তারা আত্মপ্রসাদ করেছিল যে, বাংলাদেশে আক্রান্তের শতকরা হার কমে গেছে। এই তথ্যটিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আজ যখন পরীক্ষা করা হলো কম এবং রোগীর সংখ্যা হলো ৬৬৫ জন, তখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্রিফিংয়ে ওই পরিসংখ্যানটি আর দেওয়া হলো না। আজ সংক্রমণের হার হলো ১২.৩৮, যেটি যেকোনো বিচারে মহামারীর শঙ্কা জাগায়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, বাংলাদেশে কতগুলো কারণে এখন করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে আগামী কিছুদিনের মধ্যেই। তার প্রধান কারণ হলো, গার্মেন্টসগুলো খুলে দেওয়া। গার্মেন্টসগুলো করোনা মহামারীর চারনভূমি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন একাধিক বিশেষজ্ঞ। তারা বলছেন-

প্রথমত; গার্মেন্টসে কর্মীরা যেভাবে প্রবেশ করছে, কাজ করছে এবং বেরিয়ে আসছে তাতে একজন আক্রান্ত হলে হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।

দ্বিতীয়ত; তারা মনে করছেন যে, তথাকথিত ছুটি একটি প্রহসনে পরিণত হয়েছে। মানুষ অবাধে চলাফেরা করছে, সেখানে কোনো সামাজিক দূরত্ব মানা হচ্ছে না। এই অবাধে চলাফেরার মাধ্যমে রোগ সংক্রমণ বাড়ছে।

তৃতীয়ত; সীমিত পরীক্ষার কারণে যারা নীরব উপসর্গ নিয়ে আছেন, বা যারা উপসর্গ থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষা করাতে পারছেন না, তারা সারা দেশে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে যে, করোনা পরীক্ষার জন্য অন্তত কয়েক হাজার মানুষ সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ধর্না দিলেও তারা পরীক্ষা করাতে পারছেন না।

এছাড়াও পরীক্ষায় ভুল রিপোর্টের কথাও শোনা যাচ্ছে কয়েক জায়গায়। অনেক জায়গায় যেভাবে সোয়াপ নেওয়ার কথা, সেভাবে সোয়াপ নেওয়া হচ্ছে না। এ ব্যাপারে দক্ষ প্রশিক্ষক না থাকাটা বড় ধরনের সমস্যা।

সবকিছু মিলিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলার চেয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখানোর প্রাণান্ত চেষ্টা করেছে। যার ফলে একদিকে যেমন তারা তথ্য গোপন করেছে, জগাখিচুড়ি তথ্য দিয়েছে, অন্যদিকে তারা পরীক্ষা কম করেছে। এই সবকিছুর মাশুল দিতে হবে বাংলাদেশের জনগণকে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এই সীমাহীন ব্যর্থতার কারণেই বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি আশঙ্কার চেয়েও খারাপ অবস্থায় যাচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। প্রত্যেক মহল যদি এখানে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিত, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যদি এখানে প্রকৃত বিচারে যা যা করা দরকার তা করতে পারতো, তাহলে হয়তো আমরা এই পরিস্থিতিটাকে একটি সহণীয় জায়গায় নিয়ে আসতে পারতাম। কিন্তু সেই পথ শেষ হয়ে গেছে। এখন পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করা অনেক কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।