আমলা রাজত্বে জায়গা নেই বিশেষজ্ঞদের

আমলা রাজত্বে জায়গা নেই বিশেষজ্ঞদের

এটা স্পষ্ট যে করোনা মোকাবেলায় সরকার আমলাতান্ত্রিক পথেই হাঁটছে, আমলারাই সব কিছু করছেন, আমলারাই যেন বিশেষজ্ঞ। জনস্বাস্থ্যের সমস্যাটি যেমন আমলারা দেখছেন, তেমনি একইভাবে করোনার কারণে যে অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং সেই সঙ্কট মোকাবেলার পথপদ্ধতি- সেটাও আমলাদের কবজায়। আমলাদের রাজত্বে বিশেষজ্ঞদের কোন দাম নেই, মূল্যায়ন নেই এবং জায়গাও দেয়া হচ্ছেনা।

অথচ পাশের দেশ ভারতের দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে দেখা যাবে যে, করোনা মোকাবেলায় ভারত সম্পূর্ণ বাংলাদেশের বিপরীত পথে হাঁটছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজে চিকিৎসা বিজ্ঞান, ভাইরাস বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে যারা বিশেষজ্ঞ তাঁদেরকে ডাকছেন, টেলিফোনে কথা বলছেন।

নরেন্দ্র মোদি তো গোটা ভারতের প্রধানমন্ত্রী, মমতা ব্যানার্জী তাঁর রাজ্যের অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলার জন্য অভিজিৎ ব্যানার্জীর মতো নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদের পরামর্শ নিচ্ছেন এবং ভারত নয় সারা বিশ্বেই তাই হচ্ছে। করোনাভাইরাস যেহেতু একটি নতুন ধরণের ভাইরাস, এই রোগটি যেহেতু নতুন এবং এর গতিপ্রকৃতি কেউই বুঝতে পারছে না, অর্থনীতিতে এই রোগের স্থায়ীত্ব কতদিন হবে তা নিয়েও মানুষের ধারণা নেই। কাজেই অর্থনীতিতে এর প্রভাব কি রকমভাবে পড়বে সে সম্পর্কেও সুস্পষ্ট ধারণা কারো

নেই এবং এই কারণেই এখন বিশেষজ্ঞদের দরকার সবথেকে বেশি। সব দেশেই এখন বিশেষজ্ঞদের পেছনে ছুটছে। ভ্যাকসিন আবিষ্কারের গবেষণা যেমন হচ্ছে, তেমন অর্থনৈতিক মুক্তির পথ-পদ্ধতি নিয়েও গবেষণা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ হলো অদ্ভুত এক ব্যতিক্রম। বাংলাদেশের সবজান্তা আমলারাই সবকিছু করছে। তাই পদে পদে স্ববিরোধী এবং ভুল সিদ্ধান্ত হচ্ছে, করোনার সামাজিক সংক্রমণ বেড়ে যাচ্ছে এবং আমরা জানি না যে আমরা কোথায় যাচ্ছি।

অনেকে প্রশ্ন করতে পারে যে, ভারত কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেরকম বিশেষজ্ঞ আছেন, সেরকম বিশেষজ্ঞ কি বাংলাদেশে আছে? বাংলাদেশে অনেক বড় মাপের বিশেষজ্ঞ রয়েছেন এবং যে সমস্ত বাঙালি বিশেষজ্ঞরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন, তাঁদের পরামর্শও আমরা নিতে পারি, আলোচনা করতে পারি। তাঁদের কথা বাদই দিলাম,

বাংলাদেশের কথাই যদি দেখি আমরা যে একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছে বিএমডিসির ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মোঃ শহিদুল্লাহর নেতৃত্বে। এটাই হচ্ছে জনস্বাস্থ্যের জন্য করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের একমাত্র ফোরাম বাংলাদেশে। কিন্তু এই টেকনিক্যাল কমিটিকে বাদ দিয়েই করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে সবগুলো সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে।

ছুটি বাড়ানো হয়েছে টেকনিক্যাল কমিটি জানে না, দোকান খুলে দেয়া হয়েছে টেকনিক্যাল কমিটি জানে না, গার্মেন্টস খুলে দেয়া হয়েছে টেকনিক্যাল কমিটি জানে না। কিন্তু এই টেকনিক্যাল কমিটিটাও গৎবাঁধা টেকনিক্যাল কমিটি বলেই মনে করা হচ্ছে। এখানে চিকিৎসক থাকলেও বিজ্ঞানী বা বিশেষজ্ঞ বলতে আমরা যাদের বুঝি তাঁরা নেই। যেমন বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে হাতের নাগালের মধ্যেই থাকা কয়েকজন বিশেষজ্ঞের কথা বলতে পারি যারা করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। যেমন;

অধ্যাপক ফেরদৌসী কাদরী। তিনি আইসিডিডিআরবির ইমিউনোলজি বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই ধরণের ভাইরাস এবং রোগ নিয়ে বিভিন্ন সেমিনার এবং গবেষণায় অংশগ্রহণ করছেন নিয়মিত। বাংলাদেশের পতাকা বহনকারী একজন আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী বলা যায় তাঁকে।

ডা. সমীর কুমার সাহা। তিনি শিশু হাসপাতালের মাইক্রোবায়োলজিস্ট এবং বিল গেটস ফাউন্ডেশনের সাথে তিনি কাজ করেছেন। এছাড়া চাইল্ড রিসার্স ফাউন্ডেশনের প্রধান হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক প্রকাশনা এবং গবেষণার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সুনাম বাড়িয়েছেন।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং একজন ভাইরোলজিস্ট। তিনিও বিশেষজ্ঞ হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন।

অথচ করোনা সঙ্কটের দুই মাসের মধ্যে আমরা এখনো দেখিনি যে করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে সরকারপ্রধান তো দূরের কথা, স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই তিনজনের কারো সাথে কথা বলেছেন, এক্সপার্ট প্যানেলের বৈঠকে ডেকেছেন এবং করোনা মোকাবেলা করার জন্য তাঁদের পরামর্শ নিয়েছেন।

করোনা সংক্রমণের আরেকটি দিক হচ্ছে অর্থনৈতিক সঙ্কট। এখানে অর্থনীতিতে একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে। ইতিমধ্যে সরকার প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। গার্মেন্টস খাতের প্রণোদনা দেয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে গেছে, অন্যগুলোও দেয়া হবে। অথচ এই যে অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা দেয়া হলো, এর অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি কি হবে,

কাদের টাকা দরকার হবে বা কিভাবে টাকাটা খরচ করলে সবথেকে বেশি মানুষ উপকৃত হবে, কোন কোন খাতগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা বেশি দরকার ইত্যাদি বিষয়ে অর্থনীতিবিদদের সাথে পরামর্শ করার দরকার ছিল। আওয়ামী লীগের চিন্তা অনুসরণ করে এমন অনেক অর্থনীতিবিদ আমাদের হাতের নাগালেই ছিল,

কিন্তু কোন অর্থনীতিবিদদের সাথেই আলোচনা বা পরামর্শ গ্রহণ করা হয়নি। বরং আমলারাই এই হিসেবনিকেশ করে ব্যাংকারদের সঙ্গে বসে এই প্রণোদনা প্যাকেজ ঠিক করেছেন। অথচ ড. আতাউর রহমানের মতো অর্থনীতিবিদ ছিলেন, ড. আবুল বারাকাতের মতো অর্থনীতিবিদ ছিলেন, অধ্যাপক নাজনীন সুলাতানার মতো অর্থনৈতিক বিষয়ের গবেষক ছিলেন।

আমরা ধরেই নিলাম যে, সিপিডি বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাদ দেয়া হয়েছে তাঁরা সরকারবিরোধী এই অজুহাতে। কিন্তু যারা একেবারেই আওয়ামী লীগের চিন্তাচেতনা ধারণ করেন, যারা আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদেরকেও বাদ দিয়ে আমরা এই অর্থনৈতিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছি কোন নীতিমালা বা দৃষ্টিভঙ্গির প্রেক্ষিতে,

অথবা এর পেছনে কোন গবেষণা আছে কিনা। আমলাতান্ত্রিক সমাধান বিশ্বের কোন দেশেই সঠিক সমাধান হিসেবে বিবেচিত হয়নি এবং আমলারা বিশ্বের কোন সঙ্কটের সমাধান দিতে পারেননি; বাংলাদেশে তো নয়-ই। কাজেই আমলাতান্ত্রিক সমাধান দিয়ে করোনার মতো সম্পূর্ণ নতুন একটি বহুমাত্রিক সঙ্কট সরকার কিভাবে মোকাবেলা করবে, সেটাই দেখার বিষয়।