আওয়ামী লীগেই চাপা ক্ষোভ, অসন্তোষ, হতাশা

টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ, তবে ক্ষমতায় থাকলে কি হবে দলটি ভালো নেই। দলের নেতাকর্মীদের মন খারাপ, তাঁরা হতাশ, তাঁদের অনেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। আওয়ামী লীগের ইতিহাসে এত দীর্ঘদিন দলটি কখনোই ক্ষমতায় থাকেনি। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলেও সংগঠনটিতে ঘুণে ধরেছে। দলের সিনিয়র নেতারা হতাশার সুরে বলেন যে আওয়ামী লীগের এরকম হতশ্রী অবস্থা আগে কখনো ছিলোনা।

দলের নেতাকর্মীরা জানেনা দলের কর্মসূচী কি, সংগঠনের কর্মকাণ্ড নেই বললেই চলে। কিছু কর্মকাণ্ড দলের সাধারণ সম্পাদক এবং মন্ত্রীদের বক্তৃতা, বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। দল হিসেবে আওয়ামী লীগ সংঘবদ্ধভাবে কাজ করছে না, দলের ভেতরে দুর্নীতি ঢুঁকে গেছে, করোনা মোকাবেলায় তৃণমূলের নেতাদের চালচুরির ঘটনা দলকে কলঙ্কিত করেছে, আর দলের পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা অজানা আশঙ্কায় থাকেন।

আবার একটি বড় বিপর্যয়ে পড়তে যাচ্ছে কিনা দলটি কিংবা আবার বড় ধরণের বিপর্যয়ে পড়লে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি-সক্ষমতা আছে কিনা।
আওয়ামী লীগের একজন নেতা বলেছেন, আওয়ামী লীগ এখন আদর্শহীন ফাঁপা বেলুনে পরিণত হয়েছে এবং একটি ছিদ্র হলেই দলটি চুপসে যাবে। দলের সাংগঠনিক শক্তি অন্য যেকোন সময়ের থেকে দূর্বল বলেও তাঁরা মনে করছেন। আওয়ামী লীগের মধ্যে হতাশা, ক্ষোভ এবং অসন্তোষের কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে-

১. অঙ্গসহযোগী সংগঠনগুলোর নিষ্ক্রিয়তা

আওয়ামী লীগে গত বছরে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছিল। এই শুদ্ধি অভিযানের পর বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীকে, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদককেও সরে দাঁড়াতে হয়েছিল। ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে পদ ছেড়ে দিতে হয়েছিল এবং সেই সময় বলা হয়েছিল সৎ, যোগ্য নেতৃত্ব দিয়ে অঙ্গ সহযোগি সংগঠনগুলো তৈরী করা হবে।

কিন্তু প্রায় ১ বছর হতে চললো এখন পর‌্যন্ত যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ বা অন্যান্য কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাংগ নয়। এত হতশ্রী অবস্থা আওয়ামী লীগের কখনো হয়নি। আওয়ামী লীগের একজন নেতা বলেছেন যে, সম্মেলন হওয়ার দিনের পর দিন কমিটিহীন থাকায় কার্যত এই অঙ্গসহযোগী সংগঠনগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। এর ফলে কর্মীদের মাঝে এক ধরণের হতাশা এবং অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

২. করোনা সঙ্কটে দলের ভূমিকা নেই

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণ করে দলকে সাইডলাইনে রাখার কৌশল নিয়েছেন। এই কৌশল সঠিক বা ভুল সেটা অন্য বিষয়, কিন্তু এই কৌশলের কারণে সরকারে দলের গুরুত্ব কমে গেছে, দলের থেকে সরকারি আমলাদের গুরুত্ব অনেক বেশি হয়েছে। দলের নেতাকর্মীদের অনেক কাজের জন্যে আমলাদের মুখাপেক্ষী থাকতে হয় এবং আমলাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর নির্ভর থাকতে হয়। এটা দলের যারা সার্বক্ষণিক নেতা-কর্মী তাঁদেরকে হতাশ করেছে। তাঁরা মনে করছেন যে, এইভাবে থাকলে সংগঠনের বিকাশ সম্ভব নয়।

৩. জনগণের মধ্যে আওয়ামী লীগের ইমেজ খারাপ হয়েছে

করোনা সঙ্কটের সময় শুধু নয়, শুদ্ধি অভিযানের সময় থেকেই ক্যাসিনো বাণিজ্য, আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে টাকার খনি পাওয়া কিংবা জিকে শামীমের মতো দূর্বৃত্তের সাথে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সান্নিধ্যের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। আবার করোনার সময়ে প্রান্তিক পর্যায়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের দূর্নীতি, চালচুরির ঘটনা মানুষকে হতাশ করেছে।

দেশের সবথেকে বৃহত্তম রাজনৈতিক সংগঠনটি এভাবে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এটা নিয়ে ভেবেও অনেকে হতাশ। এটা আওয়ামী লীগের ত্যাগী, পরীক্ষিত নেতাদের হতাশ করেছে এবং ফলে তাঁরা নিজেরাই নিজেদেরকে গুটিয়ে নিয়েছেন। আওয়ামী লীগের একজন নেতা জানিয়েছেন, এরকম আওয়ামী লীগ দেখতে হবে তা আমরা ভাবতেও পারিনি।

এই সমস্ত কারণে দলের ভেতর যারা সত্যিকারের নেতা আছেন তাঁদের মধ্যে এক ধরণের হতাশা কাজ করছে। আওয়ামী লীগের একজন নেতা বলেছেন যে, আওয়ামী লীগের কর্মসূচী এখন শুধু দিবসভিত্তিক কর্মসূচী। ৭ই মার্চ, ১৭ মার্চ, ২৬শে মার্চ ইত্যাদি দিবস ধরে ধরে আমাদের কিছু কর্মসূচী ছাড়া সাংগঠনিক কর্মসূচী নেই বললেই চলে। সারাদেশে সংগঠন প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গেছে। কিছু চাটুকার দুর্বৃত্তরা এখন দলকে তাঁদের ব্যবসায়িক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করছেন আর ভালো নেতাকর্মীরা কোণঠাসা হয়ে চূড়ান্ত খারাপ সময়ের অপেক্ষা করছেন। আর একারণেই দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলেও দল হিসেবে হয়তো সবথেকে দূর্বল অবস্থায় আছে আওয়ামী লীগ।