তুঘলকি সিদ্ধান্ত, নাকি টিপু মুনশি স্বেচ্ছায় বলির পাঁঠা!

বানের পানির মত গার্মেন্টস শ্রমিকরা ঢাকায় আসছেন, শুক্র ও শনিবার দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে। কারণ তাঁরা টেলিফোন পেয়েছেন যে, আগামী রোববার থেকে তাঁদের গার্মেন্টস খুলবে, আবার কাজ শুরু হবে। তাঁদের বলা হয়েছে, ঢাকা আর গাজীপুরের অনেক গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি খুলবে। শ্রমিকদের বকেয়া বেতনও দেওয়া হবে। মালিকরা তাঁদের তৈরি গার্মেন্টস সীমিত আকারে কোন কোন দেশে রপ্তানি করবেন। সারা দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে সরকার রাস্তায় পুলিশ, সেনা সদস্য নামিয়ে যখন হাট, বাজার, দোকান, পাড়া মহল্লা, ইত্যাদি সবখানে মানুষের মাঝে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টায় গলদঘর্ম, তখন এভাবে গাদাগাদি করে দলে দলে নিরাপদ দূরত্ব বজায় না রেখে এত মানুষের ঢাকায় আগমন সারা দেশ ও দেশের রাজধানীকে করোনাভাইরাস সংক্রমণের চরম ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে।

গত বুধবার বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সাংবাদিকদের বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিল্পকারখানা চালানো যাবে; শিল্পকারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত সরকার থেকে আসেনি। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সাহেবের এই বক্তব্যের পরেই কিছু গার্মেন্টস কারখানার মালিক তাঁদের কারখানা আবার চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়ে শ্রমিকদের চাকরির ভয় দেখিয়ে (!), বকেয়া বেতন দেওয়ার প্রলোভনে ঢাকা ও গাজীপুরমুখি করেছেন।

কারণ করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার দুই দফায় ১১ এপ্রিল ২০২০ পর্যন্ত সরকারী বেসরকারি সব অফিসের জন্য সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। সারা দুনিয়ায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ফলে যারা ক্রেতার তাঁদের পক্ষে থেকে হাজার ‍হাজার কোটি টাকার অর্ডার বাতিল হয়ে যায়। ফলে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্প চরম সংকটে পড়ে। লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হবার ঝুঁকিতে পড়ে। জানা গেছে যে, দুইশ` ৪০ কোটি মার্কিন ডলার অর্থমূল্যের এক্সিস্টিং অর্ডার বাতিল হয়েছে। বিজিএমইএ’র সভাপতি রুবানা হক বলেন, “যেসব এক্সিস্টিং অর্ডার বাতিল হয়েছে বা স্থগিত হয়েছে আলোচনা করে আমরা সেগুলো ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। ইইউর কিছু ক্রেতা আমরা ফেরত আনতে পেরেছি। কিন্তু অ্যামেরিকার ক্রেতাদের ফেরত আনা যাচ্ছে না।”

শ্রম মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের গার্মেন্টস মোট কারখানার সংখ্যা ৩৬৭৬টি। শুধু ঢাকা আর গাজীপুরে মোট ২,৪৪৯ টি ছোট,মাঝারী, বড় গার্মেন্টস কারখানা থাকার কথা। ২০১৮ সালে প্রকাশ করা এক জরিপের দেখা যায় যে, এই খাতে মোট ৩৩ লাখ ১৫ হাজার মানুষ কাজ করেন। তাঁদের মধ্যে সিংহভাগই শ্রমিক।

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সাহেবের একটা কথা পুরা জাতিকে যে কী ভয়ংকর করোনাভাইরাসের সামাজিক বা ক্লাস্টারের ঝুঁকিতে ফেলে দিলো তা কি তিনি বুঝতে পেরেছেন, না অনুমান করতে পেরেছেন! একজন দায়িত্বশীল মানুষের একটা কথায় পুরা জাতি কী মহাসংকটে পড়তে যাচ্ছে সেই প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে। কয়েক মাস আগে দেশে পেঁয়াজ মূল্য বৃদ্ধি নিয়েও তিনি এমন বেফাঁস কথা বলে সংকট বাড়িয়েছিলেন। সেটা ছিল টাকার মামলা। কিন্তু এবার যা হল সেটা আমাদের গোটা জাতিকে তিনি মারাত্মক করোনাভাইরাসের সামাজিক সংক্রমণের ঝুঁকিতে ফেললেন।

সোশ্যাল মিডিয়া ও নানা মাধ্যমে মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখে করোনাভাইরাসের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আগামী ১১ তারিখ পর্যন্ত কারখানা বন্ধ রাখার জন্য কারখানা মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক।

শনিবার (৪ এপ্রিল) রাতে এক অডিও বার্তায় তিনি এই আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন যে, কিছু কারখানায় করোনাভাইরাস চিকিৎসার জন্য পিঁপিঁই তৈরি হচ্ছে সেই বিবেচনায় শ্রমিকদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে বা নিরাপত্তা দিয়ে কাজ করানো হবে। তিনি শ্রমিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘শ্রমিক যদি কোনও কারণে এবং সঙ্গত কারণে উপস্থিত না থাকেন কারখানায় মানবিক বিবেচনায় তার চাকরিটি হারাবেন না। মার্চ মাসের বেতন আমাদের শ্রমিকরা পাবেনই। এটি আমরা নিশ্চিত করতে চাই। এটি আমাদের যত কষ্ট হোক, যাই হোক আমরা মার্চ মাসের বেতন দেব।’

অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল শনিবার রাতে রাজধানীমুখী মানুষের ঢল থামাতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তিনি বলেছেন, কাউকে যেন রাজধানীতে ঢুকতে না দেওয়া হয় সে জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) জাবেদ পাটোয়ারীকে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। তবে যে সব শ্রমিককে তাঁদের বাড়ি আর ঢাকার মাঝ পথে আটকে দেওয়া হচ্ছে তাঁদের থাকা, খাওয়া বা ফিরে যাওয়ার কী ব্যবস্থা হবে সে সম্পর্কে কোন পক্ষের কাছ থেকেই কিছু জানা যায়নি। তুঘলকি সিদ্ধান্তে রাস্তায় তাঁরা যে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পোহাবে তাতে কোনই সন্দেহ নেই। এখন তাঁদের মাঝে সামাজিক দূরত্ব মানার কি হবে? তাহলে কি তাঁরা ময়মন্সিঙ্ঘ এলাকার শ্রমিকদের মত পায়ে হেঁটে ঢাকায় বা গাজীপুরে এসে উঠবেন না ফিরে যাবেন!

মোট ৩,২০০ শ্রমিক কাজ করেন এমন একটি গার্মেন্টসের চেয়ারম্যানের সাথে কথা বললে তিনি খুব অবাক হয়ে বলেন, বাংলাদেশের গার্মেন্টসের কয়জন মালিক স্বাস্থ্য বিধি সম্পর্কে জানেন। এখন ঢালাওভাবে গার্মেন্টস শ্রমিকদের গ্রাম থেকে ঢাকায় এনে কাজ করানো চরম ঝুঁকির। এটা হচ্ছে নিজের কারখানায় টাইম বোমা সেট করে রাখা। ঐ মালিক নিজেই করোনায় আক্রান্ত হবেন না তার কি গ্যারান্টি আছে? কারণ পুরো ফ্লোর জুড়ে শ্রমিকরা ঘুরে বেড়াবেন কাজে। এছাড়া গ্রাম থেকে আসার সময় যারা সংক্রমিত হয়েছেন তাঁদের লক্ষণ দেখা দিতে বেশ কয়েকদিন সময় লাগবে। কিছু হলে তখন তাঁদের জীবনের মূল্য, পরিবারের দায়িত্ব কে নেবেন? তিনি সরকারী ছুটির বাইরে কাজ না করার পক্ষে মত দিয়ে বলেন, যে পরিমাণ অর্ডার বাতিল হয়েছে এর চেয়ে ক্ষতি আর কী হতে পারে এই সেক্টরের? তাই মানুষের জীবনের জন্য আরও একটু ক্ষতি হতে দিলে ১/২ বছরে তা পুষিয়ে নেওয়া যাবে।

অন্য একজন গার্মেন্টস পরিচালক বলেন, বাড়ি যাবার সময় যেভাবে শ্রমিকরা গেছেন তাতেই অনেকে সংক্রমিত হবার কথা, আরও ৪/৫ দিনের পরে যার লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তাই এখন গার্মেন্টস খোলা মানে চরম বোকামি ছাড়া আর কিছুই না। জরুরী কাজ থাকলে যারা ঢাকায় আছেন তাঁদের সাথে যোগাযোগ করে বা একই ধরণের অন্য গার্মেন্টসের মালিকের সাথে বিজিএমইএ ’র মাধ্যমে সমঝোতা করে তাঁদের শ্রমিক নিয়ে কাজ করলে দেশ-জাতি এই ঝুঁকিতে পড়তো না। গ্রাম থেকে ডেকে শ্রমিক নিয়ে আসা ঠিক হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন। শ্রমিকদের সবার টেলিফোন আছে যা দিয়ে তাঁদের ডেকে আনা হচ্ছে, বিকাশ বা অন্য উপায়ে তাঁদের বেতন দেওয়া যেতো বল তিনি মন্তব্য করেন।

করোনাভাইরাস বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় বা ক্লাস্টারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। গতকাল থেকে পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে, সারা দেশে আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। এভাবে সারা দেশ থেকে হুড়োহুড়ি করে গার্মেন্টস বা কারখানা শ্রমিকদের ঢাকায় এনে কি আমরা সারা দেশে করোনাভাইরাস বিস্তারে না গার্মেন্টস শিল্পের প্রণোদনা বাড়ানোর কৌশল হিসেবে গার্মেন্টস মালিকরা তাঁদের সহকর্মী টিপু মুনশিকে বলির পাঠা হিসেবে ব্যবহার করলেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে কয়েকদিনের মাঝেই তা টের পাওয়া যাবে এই তুঘলকি সিদ্ধান্তের ফল। মাঝপথে বিপুল সংখ্যক শ্রমিককে আটকে রেখে দুর্ভোগে ফেলার ফল কি ভালো হবে বলে টিপু মুনশি সাহেবরা মনে করেন!