তাঁদের জন্য শেষ সুযোগ?

যারা আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করেন, রাজনীতির খোঁজখবর রাখেন তারা জানেন যে শেখ হাসিনা খারাপ সময়ে কাউকে ছুড়ে ফেলে দেন না। ব্যর্থ হলেই তার মন্ত্রিসভা থেকে একজন কেউ বাদ পড়েন না। ২০০৯ এ প্রথম মন্ত্রিসভা গঠনের পর ঐ মন্ত্রিসভায় অনেকে ব্যর্থ, অযোগ্য ছিলেন। কিন্তু তাদেরকে তিনি তার পুরো মেয়াদেই রেখেছিলেন এবং দ্বিতীয় মেয়াদে এসে তাদের মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে এসেও তিনি যাদেরকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়েছিলেন, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ ছিল, এমনকি দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগও ছিল। তাদেরকেও তিনি পুরো মেয়াদে বাদ দেননি। বরং যখন মেয়াদ শেষ হয়েছে তখন তিনি নতুন করে মন্ত্রিসভা গঠন করে তারপর বাদ দিয়েছেন।

এই সময়ের মধ্যে মাত্র তিনজন মন্ত্রীকে বড় ধরনের ধাক্কা খেতে হয়েছে। তাদের মধ্যে ছিলেন প্রথম মেয়াদের সেতুমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন। সেখানে অবশ্য বিশ্বব্যাংকের একটি চাপ ছিল। ঐ মন্ত্রীর বিরুদ্ধে পদ্মাসেতু নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিল বিশ্বব্যাংক। সেসময় একটি সমঝোতার প্রক্রিয়া হিসেবে আবুল হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে সরে যেতে হয়েছিল।

দ্বিতীয় মেয়াদে শেখ হাসিনা বাদ দিয়েছিলেন লতিফ সিদ্দিকীকে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া সংক্রান্ত একটি খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করার জন্য তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। ঐ মেয়াদেই শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক এবং তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে প্রথমে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী এবং পরে তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রী করেছিলেন। অবশ্য এটা করার মূল উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে কাজের গতি আনা।

এছাড়া মন্ত্রিসভায় ছোটখাট রদবদল হয়েছে, মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন হয়েছে। তবে ব্যাপক দৃশ্যমান এবং দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি। যেমন প্রথম মেয়াদে শেখ হাসিনা ফারুক খানকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছিলেন প্রথমে। পরে ফারুক খানকে সরিয়ে জি এম কাদেরকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আবার তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা আবুল কালাম আজাদকে সরিয়ে হাসানুল হক ইনুকে তথ্যমন্ত্রী করেছিলেন।

এগুলোকে বলা যায় মাইনর সার্জারি। খুব বড় ধরনের কাউকে ব্যর্থতার কারণে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়া, গলাধাক্কা দেওয়া শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নেই। এখন যারা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের অনেকেরই এই মন্ত্রিসভায় শেষ সুযোগ। কারণ একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, যদি কোনো মন্ত্রী দায়িত্ব পালনে সক্ষম হন, ভালো কাজ করেন, তাহলে তাকে পরের মেয়াদেও রাখা হয়। যদি অন্য কোনো হিসাব নিকাশ না থাকে। আবার যদি নিতান্তই তিনি ব্যর্থ হন তো তাকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

আবার, ২০০৯ এর মন্ত্রিসভা থেকে ডা. দীপু মনি, হাছান মাহমুদ ভালো দায়িত্ব পালন করলেও দ্বিতীয় মেয়াদে তারা মন্ত্রীত্ব পাননি। কিন্তু তৃতীয় মেয়াদে তাদেরকে আবার মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। কাজেই রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে কোনো ব্যক্তিকে দায়িত্ব দিলে সেই দায়িত্বটি সফলভাবে পালনের যোগ্যতা থাকতে হয়। শেখ হাসিনার এবার বেশ কয়েকজনকে তাদের প্রাপ্যের চেয়েও বেশি সুযোগ দিয়েছেন বলে সমালোচকরা মনে করেন। এখন তাদের জন্য এই মেয়াদটি একটি পরীক্ষার সুযোগ। সম্ভবত করোনা সংক্রমণের মাধ্যমেই এটা তাদের শেষ সুযোগ হতে চলেছে। এরকম শেষ সুযোগের পরীক্ষা যারা দিচ্ছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন-

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে আসাটা ছিল অভাবনীয়। এর আগে তিনি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অনেকেই মনে করেছিলেন যেহেতু স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তার অভিজ্ঞতা রয়েছে, সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি মন্ত্রণালয়ের পূর্ণদায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারবেন। কিন্তু প্রথম দফায় গতবছরের ডেঙ্গু বিপর্যয় এবং এই বছর করোনা মোকাবেলায় তিনি এখনো স্বপ্রতিভ এবং জনআস্থার মন্ত্রী হিসেবে নিজেকে উদ্ভাসিত করতে পারেননি। যদিও তার কর্তব্যনিষ্ঠা এবং দায়িত্বপালনের আগ্রহ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তারপরেও তিনি এখন পর্যন্ত জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেননি।

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি

টিপু মুনশি দীর্ঘদিন রাজনীতি করার পর এবার মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন। একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে তার পরিচিতি রয়েছে। কিন্তু সর্বশেষ পেঁয়াজের দাম নিয়ে যে তুঘলকি ঘটনা, এরপর করোনা মোকাবেলায় বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা তিনি সঠিকভাবে পালন করতে পারেন কিনা সেটার ওপর তার ভবিষ্যত অনেকখানি নির্ভর করছে।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল

বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের রীতি ভেঙে শেখ হাসিনা সিলেটের বাইরে অর্থমন্ত্রী করেছিলেন আ হ ম মুস্তফা কামালকে। অর্থমন্ত্রী হিসেবে তিনি একের পর এক সুযোগ নষ্ট করেছেন বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ আদায় নিয়ে তার অবস্থান পরস্পরবিরোধী। এছাড়াও ব্যাংক ব্যবস্থাপনাও নেতিবাচক অবস্থায় চলে গেছে। এখন করোনা পরিস্থিতিতে যে অর্থনৈতিক মন্দা, সেই মন্দা মোকাবেলায় তিনি কি ভূমিকা পালন করেন, সেটা দেখার বিষয়।

খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার

সাধন চন্দ্র মজুমদার খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন বিতর্কিত কথাবার্তায় তিনি আলোচিত। এবার করোনা পরিস্থিতিতে যে খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং সম্ভাব্য খাদ্য পরিস্থিতি মোকাবেলার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা শুধু আওয়ামী লীগের ভেতরেই নয়, বাইরেও পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন

পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আব্দুল মোমেনের দায়িত্ব পাওয়াটা ছিল একটা বিস্ময়কর ব্যাপার। তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে এখনো নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি। বিশেষ করে করোনা পরিস্থিতিতে যখন বিদেশীরা একের পর এক দেশত্যাগ করছে, বিদেশ থেকে বাংলাদেশিদের আনার ক্ষেত্রেও তার বিচক্ষণতা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। এছাড়াও গণমাধ্যমের সামনে লাগামহীন কথাবার্তার কারণে তিনি আলোচিত-সমালোচিত। তার জন্যেও এই মেয়াদটি শেষ সুযোগ।

এই সমস্ত আলোচিত মন্ত্রীরা কি পারবেন তাদের শেষ সুযোগটা কাজে লাগাতে? এই সংকটে নিজেদের যোগ্যতাকে প্রমাণ করতে? নাকি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবেন তারা আগামীদিনে পরিত্যাক্ত হওয়ার জন্য?