শেখ হাসিনার ‘কঠিন’ পাঁচ সিদ্ধান্ত

মুজিববর্ষ উদযাপন ঘটা করে করাটা ছিল আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। এই স্বপ্ন পূরণের জন্য সব আয়োজনই সম্পূর্ণ হয়েছিল। টানা তৃতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগ সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর মুজিববর্ষ উদযাপনের ক্ষেত্রে পুরো জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। কে জানতো, এই সময়ে করোনার আঘাত আসবে? শেখ হাসিনা এই করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে মুজিববর্ষের কর্মসূচী কাটছাঁট করেছেন, বিদেশি অতিথিরা বাংলাদেশে আসছেন না।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, যখন করোনা সংক্রমণের খবরটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানে তখন তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চান এবং সাক্ষাতে তারা প্রধানমন্ত্রীকে বলেন যে, ইতালি থেকে আসা দুইজনের দেহে করোনা শনাক্ত হয়েছে, তাদের পরিবারের একজনও করোনায় আক্রান্ত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন বলেন যে, ‘জনস্বাস্থ্য সবার আগে, মুজিববর্ষ পরেও করা যাবে’।

আমরা জানি যে, কথাটা বলা যতটা সহজ, বাস্তবে ততটা সহজ ছিল না প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য। যিনি ৭৫ এর ১৫ আগস্ট তার প্রিয় পিতার নির্মম হত্যাকাণ্ডের সময় বিদেশে অবস্থান করছিলেন। তারপর এক কঠিন প্রতিকূলতাকে জয় করে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন। জনগণকে জাগিয়েছেন এবং দেশকে ক্ষুধা এবং দারিদ্র মুক্ত করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এরকম একটা সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনার জন্য পাহাড় টপকানোর মতো একটি বিষয় বলেই মনে করেন অনেকে। তবে এই সিদ্ধান্ত তাকে নিতে হয়েছে দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে। এটাই কি শেখ হাসিনার জীবনের কঠিনতম সিদ্ধান্ত? নাকি অন্যকিছু? আসুন দেখে নেয়া যাক শেখ হাসিনার জীবনের কঠিনতম সিদ্ধান্তগুলো কী কী-

১. বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রচলিত আইনে করা

১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পান এবং দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে তিনি ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন তিনি। এইসময়ে তাকে অনেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের হত্যার বিচার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে সংক্ষিপ্ত আদালতে করার জন্য পরামর্শ দিয়েছিল। কারণ যারা হত্যাকারী, তারা ইতিমধ্যে আত্মস্বীকৃত খুনী হিসেবে জাতির কাছে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশেষ ট্রাইব্যুনালের সংক্ষিপ্ত বিচারের পথে পা বাড়ালেন না। বরং তিনি বললেন, ‘না, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হবে প্রচলিত আইনে এবং প্রচলিত বিচার পদ্ধতিতে’। এটা একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ব্যাপার। শেখ হাসিনা জানতেন এই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে নানারকম ষড়যন্ত্র হবে, নানারকম চক্রান্ত হবে। কিন্তু সবকিছু উপেক্ষা করে তিনি প্রচলিত আইনের পথেই এই বিচার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করার পথ বেছে নেন। যা শেখ হাসিনাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

২. বিডিআর বিদ্রোহে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা

দ্বিতীয় মেয়াদে ২০০৮ সালে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর তার পরপরই ২০০৯ এর ফেব্রুয়ারিতে বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। এসময়ে শেখ হাসিনার ওপর চাপ ছিল সামরিক অভিযানের মাধ্যমে বিডিআর বিদ্রোহ দমন করা। কিন্তু আওয়ামী লীগ সভাপতি রক্তক্ষয় এড়াতে এবং বিশৃংখলা এড়াতে সেই রক্তপাতের পথে যাননি। বরং তিনি শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ বেছে নিয়েছেন এবং বিডিআর বিদ্রোহের হোতাদেরকে প্রচলিত আইনের আওতায় এনেছেন। তিনি যে আইনের শাসন এবগ্ন গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন সেটি আরেকবার প্রমাণ করেছেন এই ঘটনার মধ্য দিয়ে।

৩. হলি আর্টিজান ঘটনার পর জঙ্গিবাদ দমনের সিদ্ধান্ত

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ঘটে হলি আর্টিজানের মতো নির্মম ঘটনা। এ সময় সারারাত জেগে প্রধানমন্ত্রী সামরিক নির্দেশনা দেন। তার নির্দেশনাতেই হলি আর্টিজানে জঙ্গিদেরকে দমন করা হয়। এরপর তিনি সারাদেশে শুরু করেন জঙ্গিবিরোধী অভিযান। শেখ হাসিনা জানতেন যে এই জঙ্গিবিরোধী অভিযানের কারণে অনেক রকম কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। কিন্তু সব কঠিন পরিস্থিতি মাথায় নিয়েই শেখ হাসিনা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি’ গ্রহণ করেন। সেটি শেখ হাসিনাকে বিশ্বনেতায় রূপান্তরিত করেছে।

৪. ২০১৪ নির্বাচন

২০১৪ নির্বাচন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ছিল আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। বিএনপি-জামাত এ নির্বাচন বর্জন করেছিল। বাংলাদেশের অতীত ইতিহাস এরকম যে আওয়ামী লীগ, বিএনপির একটি দল যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে সেই নির্বাচনের ফলাফল জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। সেই নির্বাচনের ফলে গঠিত সংসদ স্থায়ী হয় না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণকে সাথে নিয়ে এই কঠিন পরিস্থিতি সামলে নেন। নির্বাচনে বিএনপিকে আনার জন্য যা যা করা দরকার সেটি তিনি করেন। শেষ পর্যন্ত বিএনপি যখন অগ্নিসন্ত্রাস এবং সহিংসতার পথ বেছে নেয়, তখন শেখ হাসিনা জনগণকে সাথে নিয়ে তা প্রতিরোধ করেন। এই নির্বাচন শেখ হাসিনাকে নিয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের এক অনন্য উচ্চতায়।

৫. যুদ্ধাপরাধীদের বিচার

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার আরেকটি কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। বাংলাদেশে সম্ভবত খুব কম মানুষই বিশ্বাস করতো যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্ভব হবে। বিশেষ করে, মতিউর রহমান নিজামী, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মতো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সম্ভব নয় বলে বিশ্বাস করতেন অনেকেই। কারণ এরা প্রত্যেকেই ২১ বছরের ক্ষমতায় লালিত পালিত হয়ে পরিপুষ্ট হয়েছিলেন। তাদের শেকড় অনেক গভীর পর্যন্ত ছিল। সেই বাস্তবতায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার মতো এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

শেখ হাসিনার কোন সিদ্ধান্ত কঠিনতম সেটি হয়তো তিনিই জানেন। তবে শেখ হাসিনার অবস্থান বিচার করে মুজিববর্ষের অনুষ্ঠান স্থগিত করার সিদ্ধান্তটা আবেগ-অনুভূতির দিক থেকে যে সবচেয়ে কঠিনতম তা নিঃসঙ্কোচে বলা যায়।