যে ৫ ভুলে করোনা মহামারীর শঙ্কায় বাংলাদেশ

বাংলাদেশে করোনা রোগীর সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। সীমিত আকারে যে পরীক্ষা করা হচ্ছে সেই পরীক্ষায় প্রতিদিনই নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে। যদিও সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে যে, সারাদেশে করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে, দু-একদিনের মধ্যে তা শুরু হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা চালু করা হয়নি। অন্যদিকে আইইডিসিআর-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, সীমিত আকারে হলেও সামাজিক সংক্রমণ শুরু হয়েছে এবং এটি হলো সবথেকে আতঙ্কের দিক। সামাজিক সংক্রমণ বা কমিউনিটি ট্রান্সমিশন শুরু হলেই একটি দেশে করোনা মহামারী আকার ধারণ করছে। চীন, ইতালি, ইরান, স্পেন এবং সর্বশেষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাঁর সবথেকে বড় উদাহরণ। তাই এখন প্রশ্ন উঠেছে যে, বাংলাদেশেও কি করোনা সামাজিক সংক্রমণের মাধ্যমে মহামারী আকার ধারণ করবে? নাকি বাংলাদেশ এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তরে যেমন ইতিবাচক বক্তব্য আছে, তেমনি নেতিবাচক বক্তব্যও রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, বাংলাদেশে করোনা মহামারী আকার ধারণ করার সম্ভাবনা রয়েছে মূলত ৫টি ভুলের কারণে। এই ভুলগুলো হলো-

১. সময় পেয়েও প্রস্তুতির অভাব

করোনা মোকাবেলার জন্য বাংলাদেশ যথেষ্ট সময় পেয়েছিল। যখন চীনে করোনার সংক্রমণ হয় ডিসেম্বরের শেষে, তখন থেকেই বাংলাদেশ জানতো যে, চীনের সাথে যেহেতু বাংলাদেশের দ্বীপাক্ষিক, বাণিজ্যিক এবং যাতায়াতের সম্পর্ক রয়েছে, সেহেতু বাংলাদেশে করোনা আসাটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু বাংলাদেশ যথেষ্ট প্রস্তুতি গ্রহণ করেনি। বাংলাদেশের প্রস্তুতির ঘাটতির মধ্যে ছিল-

প্রথমত; করোনা মোকাবেলায় কি কি দরকার তাঁর একটি চেকলিস্ট তৈরি করেনি। যেমন করোনা সংক্রমণ হলে কোথায় কোথায় রক্ত পরীক্ষা করতে হবে এবং রক্ত পরীক্ষায় কি কি সীমাবদ্ধতা রয়েছে সেগুলো নিয়ে কাজ করা হয়নি।

দ্বিতীয়ত; চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য কর্মীদের পারসোনাল প্রোটেক্টিভ ইক্যুইপমেন্ট (পিপিই) আগে থেকেই প্রস্তুত করেনি। মাত্র একট নামকরা হাসপাতাল প্রস্তুত ছিল। করোনা আক্রান্তদের কি ধরনের চিকিৎসা দরকার এবং কি ধরনের হাসপাতাল প্রস্তুত করা দরকার সেই প্রস্তুতি রাখা হয়নি। সারাদেশে করোনা মোকাবেলার জন্য স্বাস্থ্য সচেতনতার যে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি প্রয়োজন ছিল সেই ব্যাপারে যথেষ্ট সীমাবদ্ধতা ছিল। এর মূল কারণ হলো করোনা মোকাবেলার জন্য কি কি পদক্ষেপ নেয়া দরকার, তাঁর তালিকা করে সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়নি। এটা ছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি বড় ভুল।

২. বিদেশ ফেরতদের নিয়ন্ত্রণে না রাখতে পারার ভুল

উহান থেকে যখন ১৪০ জন বিদেশি দেশে ফিরেছিল, তখন তাঁদের আশকোনা হজ্ব ক্যাম্পে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছিল। সেই সময়ের ব্যবস্থাপনা এবং থাকার অবস্থা নিয়ে উহান ফেরতরা প্রশ্ন তুলেছিল। তখন থেকেই সরকারের কাছে বার্তা যাওয়া উচিত ছিল, যারা দেশে ফিরবে, তাঁদেরকে কোথায় এবং কিভাবে বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে রাখা যেতে পারে। যখন ইউরোপে করোনা ছড়িয়ে পরে, তখন সেই সব দেশের প্রবাসীরা দেশে ফিরলে কি করা হবে সে ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ফলে ইতালি ফেরতরা যখন আশকোনা ক্যাম্পে বিদ্রোহ করে, তখন সরকার বাধ্য হয়ে তাঁদের ছেড়ে দেয়। মূলত এখান থেকেই করোনাভাইরাস বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে সরকারের একটি বড় ভুল ছিল। সময় পেয়েও সরকার বিদেশ ফেরতদের কোয়ারেন্টাইনে রাখার কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি। এরা দেশে ফিরে হোম কোয়েরেন্টাইন তো দূরের কথা, ঘুরে বেড়িয়েছি, কেউবা বিয়ে করেছে! এই ভুলের বড় ধরনের মাশুল দিতে হচ্ছে এখন সরকারকে।

৩. হোম কোয়ারেন্টাইনের শিথিলতা এবং কঠোরতার অভাব

প্রথম থেকে যারা বিদেশ থেকে এসেছে, তাঁরা কোথায় যাচ্ছে, কিভাবে থাকবে এই ব্যাপারে কোন নির্দেশনা দেয়া হয়নি। হোম কোয়ারেন্টাইনের ব্যাপারে এওটি শিথিলতা দেখা গিয়েছিল এবং যারা বিদেশ থেকে এসে নিজের বাড়িতে যাচ্ছিল, তাঁদেরকে একটি বার্তা দেয়া কিংবা হোম কোয়ারেন্টাইনের সুনির্দিষ্ট কোন নির্দেশনা স্থানীয় প্রশাসন থেকে দেয়া হয়নি। এটিও ছিল একটি বড় ভুল।

৪. সাধারণ ছুটি

সরকার ২৬শে মার্চ থেকে ১০ দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে এবং এই ছুটি ঘোষণা করা হয় ২ দিন আগে। আমলাতান্ত্রিক দুরদর্শীতার অভাবে একদিকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়, অন্যদিকে গণপরবহন বন্ধ করা হয়নি। ফলে ছুটির খবর পেয়ে গ্রামে যেতে শুরু করে মানুষ এবং সেখানেই বাংলাদেশের করোনা সংক্রমণের সবথেকে বড় ঝুঁকিটি ছড়িয়ে পড়ে। লঞ্চে-বাসে-ট্রেনে উপচেপড়া ভিড় দেখা যায়। অথচ করোনা ঠেকানোর প্রধান উপার হচ্ছে সামাজিক দুরুত্ব মেনে চলা। কিন্তু ২ দিন আগে ছুটি দেবার কারণে সরকার একটি বড় ভুল করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ভারতে যেমন ২৫শে মার্চের রাত্থেকে লক ডাউন ঘোষণা করেছিলেন এবং লক ডাউনের ঘোষণা দিয়েছিলেন ওইদিন সন্ধ্যায়। বাংলাদেশ ২ দিন আগে ঘোষণা দিয়ে দেশে করোনা ছড়িয়ে দেবার একটি বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে বলেই অনেকে মনে করছে।

৫. বিমানবন্ধে দীর্ঘসূত্রিতা

করোনা মোকাবেলায় যে দেশগুলো সফল হয়েছে, তাঁরা প্রথমেই দেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ বিমানসহ বাংলাদেশে বহিরাগতদের প্রবেশ বন্ধের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা করেছে, বিলম্ব করেছে। যখন ইউরোপ থেকে বাঁধভাঙ্গা মানুষ এসেছে, তখন বাংলাদেশে সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। শুরু থেকেই যদি আকাশ-রেল কিংবা নৌপথ বন্ধ করা যেত তাহলে বাংলাদেশে করোনার মহামারী ঠেকানো যেত বলে মনে করা হচ্ছে।

তারপরেও মানুষ আশাবাদী যে শেষ পর্যন্ত নানা কারণে হয়তো দেশ করোনার মহামারী থেকে রক্ষা পাবে এবং সীমিত আকারে থেকেই এই ভাইরাস বাংলাদেশ থেকে বিদায় নিবে।