যে আদালতের পিয়ন বাবা, সেই আদালতেই জজ হলেন মেয়ে

বাবার হাত ধরে ছোট্ট পা ফেলে কোর্টে গেছেন অনেকবার। বাবার জীবন সংগ্রাম দেখে ছোট্ট শিশুটি বড় সিদ্ধান্ত নেয়। সারাজীবন বাবা যাদের পিছনে দাঁড়িয়ে নীরবে কাজ করেছেন একদিন তাদের মতো হয়ে বাবার কষ্ট দূর করবেন।

শুধু তাই নয়, যে আদালতে তার বাবা বছরের পর বছর সামান্য কর্মচারী হিসেবে কাজ করেছেন সেই আদালতেই বিচারকের আসনে বসতে যাচ্ছেন তিনি। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে কিন্তু স্বপ্ন পূরণের সেই দৃশ্য দেখার জন্য তার বাবা বেঁচে নেই। বাবার কথা ভেবে বারবারই মেয়ের চোখের কোণে জমে ভালোবাসার আশ্রু।

অর্চনা ভারতের বিহার রাজ্যের কানকার বাগ গ্রামের মেয়ে। বাবার মৃত্যুর পর শিশু অর্চনাকে নিয়ে শুরু হয় বিধবা মায়ের জীবন সংগ্রাম। বেশ কষ্ট করেই তাকে উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয়েছে। এর পেছনে একমাত্র অনুপ্রেরণা ছিল বাবার সেই কোর্টের চাকরি।

পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে অর্চনা স্থানীয় একটি স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। কিছুদিন পর পাটনা মেডিকেল কলেজের কেরানি রাজীভ রঞ্জনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তাদের কোল আলো করে আসে একটি শিশুসন্তান। সবকিছু স্বাভাবিক নিয়মেই চলছিল। কিন্তু কোথায় যেন একটি অভাব ছিল!

শৈশবে লালিত স্বপ্ন- বিচারক হবেন তিনি। কিন্তু ততোদিনে অনেক দায়িত্ব চেপে বসেছে কাঁধে। স্বামী-সন্তান-সংসার সামলে আবারও পড়ালেখা শুরু করতে পারবেন কি না এই দুশ্চিন্তাও ছিল তার মনে। বারবার তখন ভেসে উঠত বাবার মুখ। সাত পাঁচ ভাবনার মধ্যেই নিজের ইচ্ছার কথা স্বামী ও শাশুড়িকে জানান অর্চনা। উভয়েই তাকে অভয় দেন। শুরু হয় অর্চনার জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়।

আবারও পড়ালেখা শুরু করেন অর্চনা। ভর্তি হন আইন কলেজে। সেখান থেকে এলএলবি ও এলএলএম শেষ করেন। এরপর দিল্লিতে গিয়ে বিচারক নিয়োগের পরীক্ষার কোচিং করেন। প্রস্তুতি শেষ করে দেন বিচারক নিয়োগের পরীক্ষা। প্রথমবারের প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হন অর্চনা। হতাশা কাটিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো পরীক্ষায় বসেন। এবার উত্তীর্ণ হন তিনি। বর্তমানে বিচারক হিসেবে যোগদানের অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।

গণমাধ্যমে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তার এই সফলতার পিছনে স্বামী-শাশুড়ি এবং মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন অর্চনা। সঙ্গে বাবার কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছেন। তিনি বলেন, কেউ যদি কোন স্বপ্ন মনে ধারণ করে তবে সে যেন পিছিয়ে না যায়। যতো বাধা আসুক না কেন স্বপ্নের পিছনেই ছুটতে হবে। হ্যাঁ, স্বপ্নের পেছনে ছুটে আজ সফল হয়েছেন অর্চনা। পাঠক, এবার আপনার পালা। মনের গহীনে রাখা কোনো স্বপ্ন পূরণে অর্চনা হতে পারে আপনার অনুপ্রেরণা।