কী হয়েছিল আওয়ামী লীগের সেই বৈঠকে

দেশে করোনাভাইরাস আ’ক্রান্ত হওয়ার পর মুজিববর্ষ নিয়ে গৃহীত দলীয় কর্মসূচি পুনর্বিন্যাস করতে গত সোমবার রাতে জ’রুরি সভা করেছে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সং’সদ। দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবনে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দলের কয়েকজন উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যও অংশ নেন। এতে চলমান জে’লা-উপজে’লা সম্মেলন স্থগিত করার পাশাপাশি মুজিববর্ষ নিয়ে জনসমাগম এড়িয়ে চলতে পরামর্শ দেন দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা। দলটির কিছু নেতা, এমপি-মন্ত্রীর অতি বা’ড়াবাড়িতে দল ও স’রকারের ভাবমূর্তি ক্ষু’ণ্ন হচ্ছে বলে কেন্দ্রীয় নেতারা দলীয় প্রধানের কাছে না’লিশ করেন।

বৈঠকে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এবং কেন্দ্রীয় সদস্য আ খ ম জাহাঙ্গীরের বাহাসও ছিল সবার মুখে মুখে। বৈঠক সূত্র জানায়, দলের কেন্দ্রীয় সদস্য আনোয়ার হোসেন দলীয় সভানেত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘নেত্রী আপনি রাতদিন পরিশ্রম করছেন দেশকে এগিয়ে নিতে। আপনি দেশের জন্য, দলের জন্য অর্জন করছেন, আর আমাদের কিছু নেতা-কর্মীর বাড়াবাড়ির সেই অর্জন ধ্বং’স হচ্ছে।’ সম্প্রতি পিরোজপুরের ঘটনা উল্লেখ করে কেন্দ্রীয় এই নেতা বলেন, ‘হাকিম নড়ে তো হুকুম নড়ে না- এমন কথাই আমরা জানতাম। কিন্তু

কিছুদিন আগে আমরা পিরোজপুরে দেখলাম হুকুমও নড়ল এবং হাকিমও নড়ল। এতে আমাদের অর্জন ন’ষ্ট হয়। তারপর ৭ মার্চের আলোচনা সভার ব্যাজে দেখলাম লেখা, আমাদের দাবায়া রাখতে পারবা না, পরে তিনটা ডট। এর অর্থ কী? বুঝলাম না। এ ধরনের আরও অনেক অ’পকর্ম আছে। এ সময় দলীয় প্রধান তার কথা শোনেন। তবে কোনো উত্তর দেননি বলে জানা গেছে। সূত্র জানায়, বৈঠকের শেষ পর্যায়ে দলের কেন্দ্রীয় সদস্য আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসাইন বলেন, আমাদের দলের কিছু নেতা-এমপি-মন্ত্রীর অতি উ’ৎসাহী ক’র্মকান্ড স’রকারের সব অর্জন ম্লান করে দিচ্ছে। বগুড়ায় এক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর অ’বয়বের মু’খোশ পরে স্কুল শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রীকে স্বাগত জানায়। এটি কীভাবে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি গ্রহণ করলেন? এ সময় দীপু মনি বলেন, আমি বি’ষয়টি জানতাম না। আর আমার সেখানে যাওয়ার কথাও ছিল না। ভালোভাবে খোঁজ নিলে জানতে পারবেন।

সভা শেষে ব্যাং’কুয়েট হলের বাইরে আবার বাহাসে জড়ান দুজন। এ সময় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম দুজনকে থামানোর চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘গণভবন ঝ’গড়ার জায়গা নয়।’ এ সময় আ খ ম জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আপনি অ’ন্যায় করেছেন সেটা স্বীকার করেন। দীপু মনি বলেন, আমি তো জানতাম না। তাহলে ভুল স্বী’কার করার প্রসঙ্গ আসবে কেন?’ জাহাঙ্গীরকে উদ্দেশ্য করে দীপু মনি আরও বলেন, আর কোনো পত্রিকা দেখলেন না, শুধু প্রথম আলো দেখে বক্তব্য রাখলেন। যে পত্রিকা প্রধানমন্ত্রী নিজেও রাখেন না। পড়েন না। এক পর্যায়ে জাহাঙ্গীরকে উদ্দেশ করে দীপু মনি বলেন, আমি কি সং’স্কারপন্থি। সং’স্কারপন্থি হলে জানতাম অনেক কিছু। আ খ ম জাহাঙ্গীর আরও বলেন, ‘আপনি শিক্ষা ম’ন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বং’স করছেন।’

দেশের সর্বোচ্চ পদক ‘বঙ্গবন্ধুর’ নামে করার প্রস্তাব : দলের তথ্য ও গবেষণাবি’ষয়ক সম্পাদক ড. সেলিম মাহমুদ দেশের সর্বোচ্চ পদক ‘বঙ্গবন্ধু’ নামকরণের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রদত্ত বেসা’মরিক পুরস্কার ‘একুশে পদক’ ও ‘স্বাধীনতা পদক’র পাশাপাশি ‘বঙ্গবন্ধু’ পদক প্রবর্তন করা যেতে পারে। বঙ্গবন্ধু পদকই হবে দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় বেসা’মরিক পদক। কারণ ‘একুশে পদক’ ও ‘স্বাধীনতা পদক’ দুটিই সা’মরিক স’রকারের উত্তরাধিকারিত্ব বহন করছে। তিনি বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি কেবল স’রকারি, বেস’রকারি ও আধা-স’রকারি প্রতিষ্ঠানে নয়, দেশের সব নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের কার্যালয়েও টানানোর প্রস্তাব করেন।

এ সময় তিনি আরও বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খু’নিদের সম্পদ বা’জেয়াপ্ত করার নির্দেশ রয়েছে আ’দালতের। জাতির পিতার এক খু’নির নামে অনুমোদন নেওয়া জুবলী ব্যাংকের মালিক পরিবর্তনের জন্য হাই কোর্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু সেই নির্দেশনা না মেনে ব্যাংক তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। এটা দেখতে হবে। জবাবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা কিছু না বললেও দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘আমি তো জানি কেউ কেউ ওই ব্যাংকের শেয়ার চাইতে গেছেন।’ এ ছাড়া দলের স্বাস্থ্য সম্পাদক ডা. রোকেয়া সুলতানা ও মহিলাবি’ষয়ক সম্পাদক মেহের আফরোজ চুমকি করোনাভাইরাস নিয়ে দেশব্যাপী দলীয় প্রচারপত্র বিলি করার কথা তুলে ধরেন। দলের অর্থ ও পরিকল্পনা সম্পাদক ওয়াসেকা আয়শা খান শেয়ারবাজার নিয়ে কথা বলেন।

সূত্রমতে, সোমবার সন্ধ্যায় এ সভার সূচনা বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর শুরু হয় রু’দ্ধদ্বার বৈঠক। বৈঠকে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, এইচ টি ইমাম, কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরী, আবদুল মতিন খসরু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি, সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ড. সেলিম মাহমুদ, মহিলাবি’ষয়ক সম্পাদক মেহের আফরোজ চুমকি, স্বাস্থ্য সম্পাদক ডা. রোকেয়া সুলতানা, কেন্দ্রীয় সদস্য আ খ ম জাহাঙ্গীর, আনোয়ার হোসেন, ইকবাল হোসেন অপু প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। শো’ক প্রস্তাব পাঠ করেন দফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া। বৈঠক সূত্র জানায়, বৈঠকে দেশে করোনাভাইরাস আ’ক্রান্ত হওয়ার জন্য মুজিববর্ষের অনুষ্ঠান ছোট পরিসরে করার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, মুজিববর্ষ নিয়ে আমাদের যেমন প্রস্তুতি ছিল, তেমনি মানুষের আগ্রহ ছিল। কিন্তু করোনাভাইরাস দেখা দেওয়ার পর আমরা জনসমাগমকে এড়িয়ে চলব। তবে অবশ্যই মুজিববর্ষ কালারফুলভাবে পালন করতে হবে। এজন্য আগামী ১৭ মার্চ রাত ৮টায় সারা দেশে একযোগে আত’শবাজি করার ঘোষণা দেন। ১৭ মার্চ রাত ৮টায় জাতির পিতা জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এ সময় দলের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম দেশব্যাপী সা’জসজ্জার কথা তুলে ধরেন।