করোনায় গদি টলমল যাদের

এক করোনাভাইরাসের হানায় পুরো বিশ্ব এখন স্থবির। ব্যবসা বাণিজ্য এক প্রকার বন্ধ। একেকটি দেশ হয়ে গেছে বিচ্ছিন্ন, অভিশপ্ত দ্বীপের মতো। এই বিচ্ছিন্নতা, এই স্থবিরতার ফলে ইতিমধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা শুরু হয়ে গেছে। বড় ধসের আশংকা করা হচ্ছে। শুধু অর্থনৈতিক ধসই নয়, করোনার হানা কজন বিশ্বনেতার গদি ধসিয়ে দেয়, তা নিয়েও চলছে ফিসফাস। মহামারী রুখতে ব্যর্থতা এবং মিথ্যাচারের দায়ে বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রনায়কের নেতৃত্ব পড়ে গেছে হুমকির মুখে। এদের মধ্যে রয়েছেন-

ডোনাল্ড ট্রাম্প (যুক্তরাষ্ট্র)

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস রুখতে তার পদক্ষেপ প্রশংসনীয় বলে নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার মতে, `তিনি দশে দশ পেয়েছেন।` কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন উল্টো কথা। তাদের মতে মহামারী প্রতিরোধে খারাপ রোল মডেল হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট নির্দেশ দিতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। এমনকি আগাম সতর্কতাও নেননি। করোনা পরীক্ষার কিটের অভাব তার প্রশাসনিক ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। উন্নত দেশ হয়েও অসুস্থদের যথাযথভাবে করোনার পরীক্ষা করাতে ব্যর্থ হয়েছে আমেরিকা। যার ফলশ্রুতিতে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি করোনা আক্রান্ত এখন যুক্তরাষ্ট্রে। এর মধ্যেই গালভরা উল্টাপাল্টা বকে হাসির পাত্র হচ্ছেন ট্রাম্প। সামনেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এর আগে একের পর এক বিতর্কিত কাজ করে অভিশংসনের খাড়ায় পড়ে বেঁচে গেলেও এবার তিনি নির্বাচনে উতড়ে যেতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তাছাড়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের করোনা পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে। সেক্ষেত্রে ট্রাম্প আর কতদিন ক্ষমতায় টিকতে পারবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বরিস জনসন (যুক্তরাজ্য)

ট্রাম্পের বন্ধু ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের অবস্থা রীতিমতো শোচনীয়। করোনা রুখতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থতার কারণে তাকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে। এর উপর তিনি নিজেও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, ব্রিটেনে করোনায় লাশের সংখ্যা বাড়ছেই। চীনের উৎপত্তির প্রায় ২ মাস পর ব্রিটেনে করোনার প্রকোপ শুরু হয়। এই দীর্ঘ সময়েও করোনা প্রতিরোধে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিতে পারেননি জনসন। ব্রিটিশ যুবরাজ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। অন্য কোনো দেশের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেনি। এর মাশুল দিতে বরিসকে গদি ছাড়তে হয় কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।

নরেন্দ্র মোদি (ভারত)

ট্রাম্প, বরিসের মতো কট্টর ঘরানার আরেক নেতা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ট্রাম্প-বরিসের মতোই কাজের চেয়ে আত্ম অহংকার এবং বড় বড় বুলি আওড়াতেই তাকে বেশি দেখা যায়। শ্রেষ্ঠত্ববাদের নেশায় জনকল্যাণমুখী অনেক কিছুই উপেক্ষা করেছেন মোদি। তা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। কিন্তু তাকে ক্ষমতা হারাতে হয়নি। এবার করোনায় ধাক্কায় সেটাই ঘটে যায় কিনা তা নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে। দেশের পরিস্থিতি বিবেচনা না করে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দু মুঠো খাবার নিশ্চিত না করেই ২১ দিনের জন্য দেশ লক ডাউন করেছেন তিনি। সঙ্গে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে আবেগাপ্লুত এক ভাষণও দিয়েছেন তিনি। তা নিয়ে ভারতজুড়ে রঙ্গ তামাশাও হচ্ছে। এর থেকেও বড় কথা হচ্ছে, মোদির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে যে তার সরকার করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ে মিথ্যাচার করেছে। যার কারণে ভারতে করোনা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। যদি এমনটাই হয়, তাহলে মোদির টিকে বড় হুমকির মুখে পড়বে।

গুইসেপ্পে কন্তে (ইতালি)

বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, করোনার কারণে ইতালির সরকারের পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। ইউরোপে করোনায় সবেচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশটি হচ্ছে ইতালি। সাড়ে ছয় কোটি জনসংখ্যার দেশ ইতালি করোনায় মৃত্যু সংখ্যায় ১৩৮ কোটি জনসংখ্যার চীনকে পেছনে ফেলেছে। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি করোনায় মৃত্যু ইতালিতে (১১ হাজার ৫৯১ জন)। এর দায়ভার নিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী গুইসেপ্পে কন্তেকে সরে যেতে হবে বলেই মনে করা হচ্ছে। আর কন্তে কার্যকর ব্যবস্থা তো নিতে পারেনই নি। উল্টো তিনি উপরওয়ালা অর্থাৎ বিধাতার দিকে চেয়ে বসে আছেন। তিনি বলেছেন, করোনার নিয়ন্ত্রণ এখন আর আমাদের হাতে নেই। এখন একমাত্র বিধাতাই রক্ষা করতে পারেন। অভিযোগ আছে, করোনায় আক্রান্ত এবং মৃত্যু নিয়ে শুরুতে ইতালির সরকার মিথ্যাচার করেছিল। যার ফলে সেখানে এত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে করোনা। এমনিতেই চাপের মুখে থাকা কন্তে মিথ্যাচারের বিষয়টি প্রমাণিত হলে আরও ঝামেলায় পড়বে, তা নিঃসন্দেহেই বলা যায়।

পেদ্রো সানচেজ (স্পেন)

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ যেদিন বলেছেন, করোনা স্পেনে ততটা ক্ষতি করতে পারবে না। তার ঠিক এক সপ্তাহ পরই তার দেশে করোনা জাঁকিয়ে বসে। মৃত্যুর মিছিলে ইতালির পরের দেশটি হচ্ছে স্পেন। খোদ প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রীই করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্ত হয়েছেন উপপ্রধানমন্ত্রীও। সরকারের গা ছাড়া ভাবের কারণেই যে এই অবস্থা সেটা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার পড়ে না। ইতিমধ্যেই স্পেনে ৭ হাজার ৭০০ মানুষ মারা গেছে। সামনের কয়েক সপ্তাহে তা অনেক বাড়বে। করোণার হানার আগে থেকেই প্রধানমন্ত্রীত্ব টিকিয়ে রাখতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছিল সানচেযকে। সেই অবস্থায় মধ্যেই নতুন করে যোগ হয়েছে করোনা ব্যর্থতা। এর দায় নিয়ে পেদ্রো সানচেজকে ইস্তফা দিতে হতেই পারে।