একাই লড়ছেন শেখ হাসিনা?

মুজিববর্ষ সমাগত প্রায়। জাতি তাঁর প্রতিষ্ঠাতা পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী পালন করার জন্য প্রস্তুত। আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য হয়তো তাঁর জীবনের শ্রেষ্টতম দিন যে, তিনি দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা অবস্থায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করতে পারছেন। ১৯৭৫ সালের ১৫-ই আগস্ট যখন বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করার সময় কেউ ভেবেছিল যে জাতির পিতার এমন আলোকিত এবং স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে বাঙালি জাতির সামনে উদ্ভাসিত থাকবেন এবং পুরো জাতি দলমত নির্বিশেষে তাঁর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করবে? কিন্তু শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, ত্যাগ, দীর্ঘ সং’গ্রাম এবং দূ’রদর্শিতার কারণে এটা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।

শেখ হাসিনার কারণেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এবং বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে বাংলাদেশ আজ এগিয়ে যাচ্ছে। জাতির পিতা যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, সেই স্বপ্ন পূরণের দ্বারপ্রান্তে আজ বাংলাদেশ। এত অর্জন আর কৃতিত্বের পরেও প্রশ্ন উঠেছে যে, জাতির পিতার যে স্বপ্ন, যে আকাঙ্ক্ষা, তা কি আওয়ামী লীগ ধারণ করতে পেরেছে? এবং আওয়ামী লীগ যে রাজনৈতিক দল, যেটা জাতির পিতার মূল জীবনীশক্তি ছিল, যে দলটিকে ঘিরে তিনি আশা-আকাঙ্ক্ষার স্বপ্নকাব্য রচনা করেছিলেন, সেই দলটি কি সঠিক পথে আছে? নাকি জাতির পিতার স্বপ্ন ধারণ করে আছেন একমাত্র শেখ হাসিনা। মুজিববর্ষের প্রাক্বালে এই প্রশ্নটি অনেক প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

টানা তৃতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে এবং প্রথমেই যদি আমরা দেখি সরকারের দিকে, নীতিনির্ধারণী সব সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে শেখ হাসিনার একাকি। কোন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরাই দায়িত্ব নিয়ে নিবেদিতভাবে কাজ করছে এমন কথা বলা যাবেনা। ছোটখাটো বিষয়ে শেখ হাসিনার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। আমরা যদি দেখি, সাম্প্রতিক সময়ে করোনাভাইরাসের প্রকোপে শেখ হাসিনাকেই দিকনির্দেশনা দিতে হয়েছে, শেখ হাসিনাই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, করোনাভাইরাসের কারণে মুজিববর্ষের সকল কর্মসূচী স্থগিত করা হবে।

এখন প্রশ্ন হলো যে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কেন করোনাভাইরাসের ব্যাপারে একা সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না? শুধু করোনাভাইরাস নয়, যেকোন বিষয়ে আমরা দেখছি যে, প্রধানমন্ত্রীকে সিদ্ধান্ত দিতে হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীকেই সবকিছু করতে হচ্ছে। মন্ত্রণালয়গুলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনা এবং পরামর্শ ছাড়া যেন স্থগিত, কোন কাজ এগোচ্ছে না। মন্ত্রীত্ব যেন এখন একটি চাকরি, মন্ত্রীরা আমলাদের মতো কাজ করছেন। দু’একজন মন্ত্রী বাদ দিলে অধিকাংশ মন্ত্রীদের মাঝে রাজনৈতিক দলের মন্ত্রীর পরিচয় নেই। বরং তাঁরা ৯ টা থেকে ৫ টা পর্যন্ত অফিসের মতো মন্ত্রীত্বকে একটা চাকরি হিসেবে বেঁছে নিয়েছে।

এই মন্ত্রীসভার অধিকাংশ সদস্যদের মাঝে কোন উদ্ভাবনী নেই, কোন নতুন চিন্তা-ভাবনা নেই, দেশকে এবং তাঁর মন্ত্রণালয়কে এগিয়ে নেবার নিত্য নতুন কোন আবিষ্কারের নে’শাও নেই। শেখ হাসিনাও একজন মানুষ। তাঁরও অবসর প্রয়োজন, চিন্তা প্রয়োজন কিংবা তাঁরও বিশ্রামের প্রয়োজন। কিন্তু এই মন্ত্রিসভা বা এই সরকার কি শেখ হাসিনাকে নূন্যতম বিশ্রাম বা চিন্তার অবকাশ দিচ্ছে? একটা মানুষ দিনরাত ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা পরিশ্রম করা কি তাঁর প্রতি অবিচার নয়? সরকারের কথা বাদই দিলাম, শেখ হাসিনা গত ১১ বছরে দেশকে যে স্থানে নিয়ে গেছে, এখন যদি সরকার তাঁর রুটিন কাজটা পালন করে তাহলেই দেশ অনেক এগিয়ে যায়। এখন বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেছে, এখন সরকারের দায়িত্ব হলো স্টি’য়ারিংটা ঠিকভাবে ধরে রাখা।

কিন্তু দলের কি অবস্থা? দলেও যেন সব সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে শেখ হাসিনাকে একাকী। পাপিয়ার গ্রে’প্তারের কথা কেন শেখ হাসিনাকে বলতে হবে? আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা কেন পাপিয়া অপরাধ করছে জেনেও ব্যবস্থা নেয়নি? এর আগে জিকে শামীম কিংবা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট- সব ব্যাপারে শেখ হাসিনাকে কেন সিদ্ধান্ত নিতে হবে?

দলে শু’দ্ধি অভিযান কিংবা বি’দ্রোহীদের দমন করা বা শৃ’ঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, অনুপ্রবেশকারীদেরকে প্রবেশ বন্ধ করা সব কিছুই কেন শেখ হাসিনাকে দেখতে হচ্ছে?

সব ভরসার শেষ আশ্রয়স্থল শেখ হাসিনাই। তাকে পরামর্শ কিংবা সু- পরামর্শ দেওয়ার কেউ নেই। শেখ হাসিনার সঙ্গে যারা দেখা করতে আসেন তারা সবাই নিজেদের তদবির নিয়ে, নিজেদের কোন সমস্যা নিয়েই আসেন। শেখ হাসিনার কি কোন সমস্যা থাকতে পারে না? তিনি কি একজন মানুষ নন? তাকে কি কেউ পরামর্শ দেয়? তার বোঝা কি কেউ লাঘব করার চেষ্টা করে? মুজিববর্ষে এই প্রশ্নটা আমাদের সামনে এসেছে। কারণ শেখ হাসিনা রাষ্ট্র পরিচালনা, দল পরিচালনা করতে গিয়ে মনে হয়েছে তিনি একাকি নি:সঙ্গ একজন মানুষ। তাকে যদি সহায়তা না দেওয়া হয় তাহলে এই ভার তিনি কতদিন বইতে পারবে?

একটা কথা আমাদের বুঝতেই হবে, শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশের উন্নয়নের সমর্থক। শেখ হাসিনা আছে বলেই বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে হেঁটে চলেছেন। শেখ হাসিনা আছেন বলেই আজ বাংলাদেশ বিশ্বের রোল মডেল। শেখ হাসিনা আছেন বলেই বাংলাদেশ আজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তার দরকার সৎ, নিষ্ঠাবান সহযাত্রী। সেই সহযাত্রী কি শেখ হাসিনা পাচ্ছেন?