অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে আওয়ামী লীগ

তৃতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগের একবছর পূর্ণ হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে আওয়ামী লীগ ভেতরে বাইরে নানা রকম অস্থিরতায় ভুগছে। এই অস্থিরতার কারণে অনেক অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন যে, আগামী ১৭ মার্চ থেকে মুজিববর্ষ শুরু হচ্ছে। মুজিববর্ষ বাঙালি জাতির জন্য একটি অবিস্বরণীয় সময়কাল। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষীকি জাতির জন্য একটি গৌরবের মাস। অথচ এই মুজিববর্ষের আগে এ ধরণের ঘটনা অনভিপ্রেত, অনাকাঙ্খিত এবং অপ্রত্যাশিত। আওয়ামী লীগ সাম্প্রতিক সময় যে বিতর্কগুলোতে জড়িয়ে পড়েছে;

জামিন বিতর্কে বিচারক পরিবর্তন:গত বুধবার দুর্নীতি দমন কমিশনের এক মামলায় পিরোজপুরের সাবেক এমপি আউয়ালের জামিন আবেদন বাতিল করে সস্ত্রীক কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর একটি অদ্ভূত পরিস্থিতি তৈরী হয়। এই পরিস্থিতির মুখে চার ঘন্টার ব্যবধানে বিচারককে বদলি করা হয় এবং নতুন ভারপ্রাপ্ত বিচারক দিয়ে আউয়াল দম্পতির জামিন দেওয়া হয়।

এই বিচারক পরিবর্তনের ঘটনা সারাদেশজুড়ে বিতর্ক তৈরী করেছে। এমনকি বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ কেন বিচারক পরিবর্তন করা হলো সে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এ ব্যাপারে আইন মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা চেয়েছে। এরকমভাবে বিচারক পরিবর্তন পুরো বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর একটি বড় আঘাত বলে মনে করছেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ আইনজীবীরা।

এই বিচারক পরিবর্তনের বিতর্ক আওয়ামী লীগ চাইলেই এড়াতে পারতো। আউয়াল দম্পতির যদি জামিন বাতিল হতো, তারা যদি কারাগারে যেতেন তাহলে দলের কি মহাভারত অশুদ্ধ হতো?এর আগেও অনেক দলীয় এমপিকে কারাগারে যেতে হয়েছে। আইন যদি সবার জন্য সমান হয়, তবে আউয়াল দম্পতি কি আইনের বাইরে? এই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে অনেক মহলেই।

সরকারের বিরুদ্ধে এমপির হুংকার:আউয়ালের এই বিতর্কের দিনেই আরেক এমপি তার অবৈধ দখলদারি জমি উদ্ধার করার জন্য হুমকি-ধামকি দিয়েছেন সরকারি কর্মকর্তাদেরকে। বিআইডব্লিউটিএ এর কর্মকর্তারা দখলকৃত নদীর জমি উদ্ধার করতে গেলে ঢাকা ১৪ আসনের এমপি আসলামুল হক সেখানে যান।

তাদেরকে সেখানে তিনি হুমকি-ধামকিও দেন। গণমাধ্যমে ফলাও করে সেসব ছবিও ছাপানো হয়েছে। শাসক দলের একজন এমপির সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে এরকম আচরণে জনগণ বিস্মিত এবং হতবাক। এই ক্ষমতার দাপট সাধারণ মানুষ পছন্দ করছেন না। অথচ এটি একটি সরকারি সিদ্ধান্ত। একজন এমপি সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন কীভাবে? এরকম বিতর্কেই বা সরকার কীভাবে জড়িয়ে পড়ে?

পানি এবং বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি:মুজিববর্ষের আগে আগে পানি এবং বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সরকারের জন্য আরেকটি অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক। এমনিতেই দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, করোনাভাইরাসের কারণে ব্যবসা বাণিজ্যের সৃষ্টি হয়েছে। তার মধ্যে বিদ্যুতের দামবৃদ্ধি কেন করতে হবে এটা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন। এ নিয়ে শাসকদলের মধ্যেও চাপা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। অনেকে মনে করছেন, জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী ১৭ মার্চ, সেখানে রাষ্ট্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন রয়েছে। এরপরে এটা করলেও কোনো সমস্যা হতো না।

সড়ক আইন করে সেটা বাস্তবায়ন না করা:নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে সরকার নতুন সড়ক আইন তৈরি করে। সেই সড়ক আইনে দুর্ঘটনার জন্য শাস্তির পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু নিরাপদ সড়ক আইন এখনো বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। সরকারের ভেতরেই একটি প্রভাবশালী মহলের চাপেই এটা সম্ভব হচ্ছে না বলে অনেকে মনে করছেন।

নিরাপদ সড়ক আইন বাস্তবায়ন না করার ফলে সড়ক দুর্ঘটনা আবার আগের মতোই বেড়েছে। প্রতিদিনই প্রাণহানির খবর পাওয়া যাচ্ছে। আমরা সবাই জানি যে ,সরকারের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং জনপ্রিয়তা রয়েছে। তাহলে এরকম সড়ক আইন করার পর সেটির বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না কার স্বার্থে?

ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা:ব্যাংকিং সেক্টরে অস্থিরতা নিয়েও জনমনে অনেক অস্থিরতা বিরাজ করছে। এ ব্যাপারে সরকার কঠোরভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না বলেও অনেকের অভিযোগ। এই ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা নিয়ে সরকার নতুন বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছে।

এসব বিতর্ক অনাকাঙ্ক্ষিত এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন এ ধরনের বিতর্কগুলো পুঞ্জীভূত হয়েই জনঅসন্তোষ তৈরি করতে পারে। কাজেই নতুন নতুন বিতর্ক তৈরি না করে সরকার যদি তার নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের কাজে মনোযোগী হয়, সেটাই সকলের জন্য মঙ্গল।